সব
facebook netrokonajournal.com
আত্মহত্যা থেকে বাঁচার উপায় : মুফতি আতাউল্লাহ বাশার | নেত্রকোণা জার্নাল

আত্মহত্যা থেকে বাঁচার উপায় : মুফতি আতাউল্লাহ বাশার

প্রকাশের সময়:

আত্মহত্যা থেকে বাঁচার উপায় : মুফতি আতাউল্লাহ বাশার

ইসলামিক জার্নাল ডেস্ক:
আত্মহত্যা একটি মানুষিক ব্যাধি যা নিজেকে ধ্বংসের প্রতি অনুপ্রাণিত করে । বিশেষ করে উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েরা এই ব্যাধিতে বেশি আক্রান্ত ।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে পুরুষের তুলনায় নারী আত্মহননের সংখ্যা বেশি । সারা বিশ্বে দশ লাখেরও অধিক মানুষ প্রতি বছর আত্মহত্যা করে। অথচ ইসলাম ধর্মে নিজের মৃত্যু কামনা করাও নিষেধ করা হয়েছে , আত্মহত্যার পরিনাম তো হলো আরো ভয়াবহ। বিশেষত এটি একটি জঘন্যতম মহাপাপ।

আল্লাহ তাআলা মানুষকে মরণশীল করে সৃষ্টি করেছেন।একমাত্র তিনিই জন্ম দেন এবং তিনিই মৃত্যু দিবেন। এদেহ-মন ও জীবন যৌবনের একমাত্র মালিক তিনিই ।
তাই মানুষের অধিকার নেই নিজের প্রতি কোনরূপ জুলুম করে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়ার। আল্লাহ তায়ালা এমন কাজকে মোটেই পছন্দ করেন না। শরীয়তের নির্দেশনায় যদিও আত্মহত্যাকারীর জানাযা হয়, তবু রাসূল সা. নিজে কখনো তাদের জানাযা পড়াননি ।

আত্মহত্যা ইহকাল, পরকাল উভয়টি ধ্বংস করে দেয় ; এ কথা জানা সত্বেও সাংসারিক চাপ, দাম্পত্য কলহ, অতিরিক্ত রাগ-অভিমান, প্রিয়োজনের কাছে অবহেলা, বিশেষত জীবনের প্রতি নৈরাশা আত্মহত্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায় । এছাড়া আরো যে সব কারণে আমাদের সমাজে এই জঘন্যতম কাজটি ঘটে, তা হলো- স্বামী-স্ত্রীর মাঝে অমিল, পরকিয়ার পাপযাত্রা, যৌতুকের দাবি , প্রেম-ভালবাসায় ব্যর্থতা, মানুষিক দুশ্চিন্তা, টাকা-পয়সা বাজেয়াপ্ত ইত্যাদি কারণে জ্ঞান বুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়। নিজকে অসহায় ও ভারসাম্যহীন মনে হয় । বুকের বাম পাশে তিব্র ব্যথা অনুভূত হয় , বিনিদ্র রজনীর মর্মান্তিক যাতনা , উদাসী চিত্তের উদ্ভট কল্পনা ও বেঁচে থাকার সংগ্রামে দারুন অধর্য্য প্রকাশ । তখনই মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

কীভাবে ঠেকাবেন এ আত্মহত্যা:
হে প্রিয় তুমি ভাবো ! জীবনটা কোন পুতুল নয় এবং টাকার কেনা সুলভ পন্যও নয় যে আবার কিনতে পারবে। তাহলে ঠুনকো অজুহাত বা সাময়িক কষ্টে অমূল্য এ জীবন ধ্বংস করার কথা ভাবতে পারো কিভাবে ?
তুমি মরে গেলে তো হেরে গেলে । এ পৃথিবী অস্থায়ী ।

এখানের সুখ-দুঃখ ও জয়-পরাজয় সবই ক্ষণিকের । এ সামান্য কষ্ট তুমি সইতে পারছো না , মৃত্যু যন্ত্রনা কিভাবে সইবে ? তা কতো কষ্টের তুমি জানো! যখন জানবে তখন আর ফিরে আসবে না।

সাফল্য ও ব্যর্থতা, ভালো থাকা ও মন্দ থাকা এগুলো জীবনের অনুসঙ্গ। ঘুরে ফিরে সবই আসে। সময়ের উপর ধৈর্য রাখো। আজ না হয় কাল তুমি সুখী হবে এবং সম্মানিও হবে। ভালো কিছু হতে, ভালো কিছু পেতে কখনো সময় লাগে। আবার কারো জীবনে তাড়াতাড়ি আসে। কিন্তু আসে।

দেখো! যারা আত্মহত্যা করেছে এবং যাদের কারণে করেছে তারা তো দিব্যি সুখে ঘর করছে । হয়তো কেউ তোমাকে অবহেলা করেছে এবং দারুনভাবে ঠকিয়েছে এ কারণে তুমি মরে যেতে চাও ! নিজেকে ধ্বংস করতে চাও!

আরে নাহ ; তুমি মরবে না । কেননা তুমি হয়তো কাঙ্খিত হৃদয়ে স্থান পাওনি, পাষাণ চোখে মায়া দেখনি তাতে কি ? অপেক্ষা করো! কারো আকাশে তুমি চাঁদ হয়ে আলো দিবে, ফুল হয়ে সুবাস দিবে,কাব্য কবিতায় ছন্দ হয়ে মন জোড়াবে। দেখবে, এমন কেও আসবে যার ভুবনে তুমি বিশাল এক পৃথিবী।

বিশেষ করে তখন আল্লাহর স্মরণাপন্ন হও । হৃদয় পাপমোক্ত করো। অন্তরের স্রষ্টাকে অন্তরে বসাও। অধিক পরিমাণে জিকির করো। কেননা জিকির অন্তরে প্রশান্তি আনে। সবসময় ব্যস্ত থাকো । মানুষদের সাথে মিশে থাকো। বাবা-মা বেঁচে থাকলে তাদের কাছে সময় কাটাও এবং তারা তোমাকে ভিষণ ভালবাসে তা অনুভব করো। আরো বেশি কষ্ট নিয়ে যারা বেঁচে আছে তাদের দেখে অনুপ্রাণিত হও ।

কুরআনে আত্মহত্যা প্রসঙ্গ :
এক. আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘আর তোমরা আত্মহত্যা করো না, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়াশীল। (সুরা নিসা : ২৯)
দুই.‘তোমরা তোমাদের নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ কর না।’(সূরা বাকারা; ১৯৫ আয়াত)
তিন. তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ যাবতীয় অপরাধ মার্জনা করেন।’ (সূরা জুমার; ৫৩ আয়াত)
চার. যে ব্যক্তি কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করে , জগতে বিপর্যয় সৃষ্টি বা হত্যার শাস্তি ব্যতিরেকে। সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে। আর যে ব্যক্তি কোনো ব্যক্তিকে রক্ষা করে সে যেন সব মানুষকেই রক্ষা করে। (সূরা মায়িদা : ৩২ আয়াত)।

হাদিসে আত্মহত্যা প্রসঙ্গ :
এক. রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যে এক ব্যক্তি ছিল। সে আহত হয়ে ছটফট করতে লাগল। এ অবস্থায় সে ছুরি নিয়ে নিজেই নিজের হাত কাটল ও ব্যাপক রক্তপাত ঘটাল এবং তার মৃত্যু হলো।’ আল্লাহ এ ব্যক্তি সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমার এ বান্দা নিজের ব্যাপারে খুব তাড়াহুড়া করে ফেলছে। এ কারণে আমি তার প্রতি জান্নাত হারাম করে দিয়েছি।’ (বোখারি :৩২৭৬)

দুই. আবু হোরায়রা রা. থেকে বর্ণিত নবিজি সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামে অনুরূপভাবে আত্মহত্যা করতেই থাকবে এবং এটিই হবে তার স্থায়ী বাসস্থান। যে ব্যক্তি বিষ পান করে আত্মহত্যা করবে, তার বিষ তার হাতে থাকবে জাহান্নামে সে সর্বক্ষণ বিষ পান করে আত্মহত্যা করতে থাকবে। আর এটা হবে তার স্থায়ী বাসস্থান। আর যে ব্যক্তি লৌহাস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করবে, সে লৌহাস্ত্রই তার হাতে থাকবে। জাহান্নামে সে তা নিজ পেটে ঢুকাতে থাকবে, আর সেখানে সে চিরস্থায়ীভাবে থাকবে।’ (বোখারি ও মুসলিম )

তিন. অন্য এক হাদিসে বলা হয়েছে, আর যে ব্যক্তি বিষপানে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে অবস্থান করে ওই বিষ পান করতে থাকবে এবং সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে। আর যে ব্যক্তি পাহাড় থেকে নিক্ষেপ করে আত্মহত্যা করবে, সে ব্যক্তি সর্বদা পাহাড় থেকে জাহান্নামের আগুনে পতিত হতে থাকবে, এভাবে সে ব্যক্তি সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে। (মুসলিম)
রাসূল (সাঃ) আরো বলেছেন–
যে ব্যক্তি ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে সে দোজখে অনুরূপভাবে নিজ হাতে ফাঁসির শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। আর যে বর্শা ইত্যাদির আঘাত দ্বারা আত্মহত্যা করে- দোজখেও সে সেভাবে নিজেকে শাস্তি দেবে।

আত্মহত্যা একটি ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধি ।
মাঝেমধ্যেই পত্রিকার পাতায় আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশিত হতে দেখা যায়। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে হতাশ নারী-পুরুষ বেছে নেয় আত্মহননের দুর্ভাগ্যজনক পথ। ইসলামে আত্মহত্যা মহাপাপ জেনেশুনেও যাদের পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষমতা দুর্বল, তারাই ধ্বংসাত্মক ও মর্মান্তিক ভ্রান্ত পথে পা বাড়ায়। তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংস নয়, সৃষ্টির পথে এগিয়ে যেতে হবে। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, অনেক উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবী, শিল্পপতি, ব্যবসায়ীও এমন দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত নয়।

শিক্ষিত অশিক্ষিত ছাড়াও আত্মহত্যা এখন যুবক-প্রৌঢ় ও শিশুদের মধ্যেও পরিলক্ষিত হয়। মূলত ধৈর্যের অভাবেই মানুষের মাঝে এমন একটি মহাপাপের বিস্তার ঘটছে। এছাড়া শয়তানের কু-প্ররোচনা তো আছেই। সব বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে শয়তানের ধোঁকা থেকে বেঁচে ইসলামের আইন ও অনুশাসন মেনে চলার মাধ্যমেই কেবল এই মহাব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে আত্মহত্যার মতো মহাপাপ থেকে বাঁচার এবং বিপদে-আপদে ধৈর্য ধারণ করার তওফিক দান করুন। আমিন।

আত্মহত্যাকারীর জানাযা:
আত্মহত্যা মহাপাপ এতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহের অবকাশ নেই , তবে ইসলামী শরীয়তে সকল মুসলমানেরই জানাযা পড়ার নির্দেশ রয়েছে । তাই আত্মহত্যাকারীরও জানাযা পড়তে হবে । তবে সমাজের বরেণ্য ও অনুসরণীয় আলেমগণ এরূপ ব্যক্তির জানাযায় অংশ গ্রহণ থেকে বিরত থাকবে । দুররুল মুখতার ২/২১১

লেখক: মাদ্রাসা শিক্ষক ও ইমাম।

আপনার মতামত লিখুন :

 ফেসবুক পেজ

 আজকের নামাজের ওয়াক্ত শুরু

    নেত্রকোণা, ময়মনসিংহ, ঢাকা, বাংলাদেশ
    শুক্রবার, ৭ অক্টোবর, ২০২২
    ১০ Rabi' I, ১৪৪৪
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ৪:৩৭ পূর্বাহ্ণ
    সূর্যোদয়ভোর ৫:৫২ পূর্বাহ্ণ
    যোহরদুপুর ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ
    আছরবিকাল ৩:০৯ অপরাহ্ণ
    মাগরিবসন্ধ্যা ৫:৪১ অপরাহ্ণ
    এশা রাত ৬:৫৬ অপরাহ্ণ
এর আরও খবর
জুমার দিনের ফজিলত ও জুমার আগে চার আমল

জুমার দিনের ফজিলত ও জুমার আগে চার আমল

প্রস্রাব-পায়খানার পর ঢিলা বা টিস্যু ব্যবহারের পরেও পানি খরচ কি খুব জরুরি?

প্রস্রাব-পায়খানার পর ঢিলা বা টিস্যু ব্যবহারের পরেও পানি খরচ কি খুব জরুরি?

মাদকের ভয়াল থাবা: শাস্তি ও প্রতিকারের উপায়

মাদকের ভয়াল থাবা: শাস্তি ও প্রতিকারের উপায়

দুর্গাপুরে আবু তালহা রা: মাদ্রাসায় ২৬ জন শিক্ষার্থীর কোরআন শরীফ ছবকদান

দুর্গাপুরে আবু তালহা রা: মাদ্রাসায় ২৬ জন শিক্ষার্থীর কোরআন শরীফ ছবকদান

কন্যা সন্তান উত্তম : মুফতি আতাউল্লাহ বাশার

কন্যা সন্তান উত্তম : মুফতি আতাউল্লাহ বাশার

আত্মহত্যা থেকে বাঁচার উপায় : মুফতি আতাউল্লাহ বাশার

আত্মহত্যা থেকে বাঁচার উপায় : মুফতি আতাউল্লাহ বাশার

সর্বশেষ সংবাদ সর্বাধিক পঠিত
 
উপদেষ্টা সম্পাদক : দিলওয়ার খান
সম্পাদক ও প্রকাশক : মুহা. জহিরুল ইসলাম অসীম  
অস্থায়ী কার্যালয় : এআরএফবি ভবন, ময়মনসিংহ রোড, সাকুয়া বাজার, নেত্রকোণা সদর, ২৪০০ ।
ফোনঃ ০১৭৩৫ ০৭ ৪৬ ০৪, বিজ্ঞাপনঃ ০১৬৪৫ ৮৮ ৪০ ৫০
ই-মেইল : netrokonajournal@gmail.com
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।