সব
facebook netrokonajournal.com
আনন্দমোহন বসু: বিশ্বের প্রথম গণিতের র‍্যাংলার | নেত্রকোণা জার্নাল

আনন্দমোহন বসু: বিশ্বের প্রথম গণিতের র‍্যাংলার

প্রকাশের সময়:

আনন্দমোহন বসু: বিশ্বের প্রথম গণিতের র‍্যাংলার আনন্দমোহন বসু: বিশ্বের প্রথম গণিতের র‍্যাংলার

 

‘র‌্যাংলার’ কী ?
গণিত বা অংকের ওপর দেওয়া সর্বোচ্চ উপাধি, যা ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেওয়া হয়। আর আনন্দমোহন বসু’ই প্রথম একমাত্র বাঙালি, যিনি এই কৃতিত্ব অর্জন করেন। গণিতের এই সর্বোচ্চ তিনটি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে, তিনবারই সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে ‘র‌্যাংলার’ উপাধী লাভ করেন আনন্দমোহন বসু, ১৮৭৪ সালে। শুধু এইটুকুই নয়, বাংলা তথা ভারতের শিক্ষা, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে আনন্দমোহন বসুর উপস্থিতি রীতিমত এক বিস্ময়, যা আমরা অনেকে জানি না, অনেকে জেনেও ভুলে আছি।

অবিভক্ত বাংলার কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা থানায় জয়সিদ্ধি গ্রামে ১৮৪৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আনন্দমোহন বসু জন্ম নেন। তাঁর বাবা পদ্মলোচন বসু ময়মনসিংহ জেলা জজ আদালতের পেশকার ছিলেন, মা উমাকিশোরি দেবী। আনন্দমোহন বসু যখন পড়াশোনা করছেন, সেই ছাত্র অবস্থায় তাঁর সঙ্গে ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ভগবানচন্দ্র বসুর মেয়ে, মানে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু’র বোন স্বর্ণপ্রভা দেবী’র সাথে বিয়ে দেওয়া হয়। পরে আনন্দমোহন বসু সস্ত্রীক ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন।

আনন্দমোহন বসুর প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় ময়মনসিংহেই। মেধাবী আনন্দমোহন বসু ১৮৬২ সালে হার্ডিঞ্জ স্কুল (বর্তমান ময়মনসিংহ জিলা স্কুল) থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় মেধা তালিকায় নবম স্থান অধিকার করে এনট্রান্স পরীক্ষা পাশ করেন। পরে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ.এ এবং বি.এ, পরপর দুটো পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করেন। দুটো পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করার মতো অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য তিনি ১৮৭০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দশ হাজার টাকার ‘প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ’ বৃত্তি লাভ করেন। এই বৃত্তি পেয়ে তিনি ইংল‍‍্যান্ড যান আরো বেশি পড়াশোনার জন‍্য। সেখানেই তিনি ‘র‌্যাংলার’ উপাধী লাভ করেন এবং ওই বছরই ১৮৭৪ সালে ‘বার-এট-ল’ ডিগ্রী লাভ করে দেশে ফিরে আসেন, শুরু করেন আইন ব্যবসা।

আনন্দমোহন বসু ও দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীর চেষ্টা ও সহযোগিতায় নারীদের মাঝে শিক্ষার আলাে ছড়িয়ে দিতে ১৮ সেপ্টেম্বর ১৮৭৩ সালে প্রথম ছাত্রীনিবাস সহ ‘হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়’ স্থাপিত হয়। বছর দুয়েক পরে সমাজের কিছু জনের বিরুদ্ধতায় এই বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে গেলে, ১ জুন ১৮৭৬ সালে আনন্দমোহন বসু ও দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী স্থাপন করেন ‘বঙ্গ মহিলা মহাবিদ্যালয়’। এই বিদ্যালয় ছাত্রীদের প্রবেশিকা পরীক্ষা এবং মহিলাদের মেডিকেল কলেজে পড়ার অধিকারের বিষয়ে আন্দোলনে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করে। কিন্তু আনন্দমোহন বসু চিন্তা করেন যে এইভাবে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছর আগে ঘটে প্রথম শিক্ষাক্ষেত্রে এক সংযুক্তিকরণ। ছাত্রীদের উচ্চ শিক্ষার সুযোগের জন‍্য আনন্দমোহন বসুর এই বিদ‍্যালয় মিশে যায় বেথুন স্কুলের সাথে, ১ আগস্ট ১৮৭৮ সালে।

আনন্দমোহন বসু, দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী ও দুর্গামোহন দাস প্রমুখের আন্তরিক চেষ্টায় বেথুন স্কুলের সর্বোচ্চ শ্রেণীর দুজন ছাত্রী কাদম্বিনী বসু ও সরলা দাস কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেবার অধিকারী হন। ১৮৭৮ সালে কাদম্বিনী বসু প্রথম মহিলা এন্ট্রান্স পাস হবার গৌরব অর্জন করেন। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নারী শিক্ষার দরজা খুলে যায়। কেবল তাই নয়, আনন্দমোহন বসু, দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী, দুর্গামোহন দাস, শিবনাথ শাস্ত্রী প্রমূখের আন্দোলনে ১৮৭৮ সালের ২৭ এপ্রিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট কমিটি মহিলাদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী লাভের দাবি মেনে নেয় এবং ১৮৮২ সালে কাদম্বিনী বসু ও চন্দ্রমুখী বসু প্রথম মহিলা স্নাতক হবার সম্মান অর্জন করেন। এছাড়াও আনন্দমোহন বসু বেঙ্গল প্রভিনসিয়াল কমিটির মাধ্যমে ১৮৮১ সালে শুধু ছাত্রীদের জন্য হোস্টেল ব্যবস্থা করেন।

নারী শিক্ষার ধরণ-ধারণ ও কিছু সামাজিক কাজ নিয়ে ব্রাহ্মনেতা কেশবচন্দ্র সেনের সাথে মতবিরোধ হয় আনন্দমোহন বসুর। ১৮৭৮ সালের ১৫ মে আনন্দমোহন বসু ‘সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ’ প্রতিষ্ঠা করেন দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী, শিবনাথ শাস্ত্রী, শিবচন্দ্র দেব, উমেশচন্দ্র দত্ত প্রমুখ কে সাথে নিয়ে। প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন আনন্দমোহন বসু। সাধারন ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলনের ছাত্র শাখা হিসাবে ১৮৭৮ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি ‘ছাত্রসমাজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৭৯ সালে, তিনি ছাত্র সমাজের আন্দোলনের উদ্যোগ হিসাবে ‘কলকাতা সিটি কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন, এটি এখন ‘আনন্দমোহন কলেজ’। ১৮৮৩ সালে তিনি ময়মনসিংহে ‘সিটি কলেজিয়েট স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন।

রাজনীতিতে আনন্দমোহন বসু ছিলেন অগ্রদূত। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতিতে আগ্রহী ছিলেন। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন তিনি আরও কয়েকজন ভারতীয়ের সাথে “ইন্ডিয়া সোসাইটি” প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বাংলা তথা ভারতের ছাত্রদের মধ্যে স্বদেশপ্রাীতি জাগানোর উদ্দেশ্যে ১৮৭৫ সালে গঠন করেন ‘স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন’। ২৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭৫ সালে অমৃত বাজার পত্রিকার সম্পাদক শিশির কুমার ঘোষ ও তাঁর ভাই মতিলাল ঘোষ ‘ইন্ডিয়া লীগ’ প্রতিষ্ঠা করেন আনন্দমোহন বসুর সহযোগিতায়। ১৮৭৬ সালে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় তাঁর সাহায‍্যেই গঠন করেন ‘ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন’ বা ‘ভারত সভা’; ১৮৮৪ পর্যন্ত যার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আনন্দমোহন বসু। ১৮৯৮ সালে আনন্দমোহন বসু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ফেডারেশন হলে অনুষ্ঠিত বঙ্গভঙ্গবিরোধী প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেন আনন্দমোহন বসু, সেখানে গুরতর অসুস্থার কারণে তিনি উপস্থিত থাকতে পারেননি, তাঁর সভাপতির বক্তব্য পাঠ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অসুস্থ আনন্দমোহন বসু ১৯০৬ সালের ২০ আগস্ট পরলোক গমন করেন।

অভুতপূর্ব রাজনৈতিক সংগঠনের অধিকারী, সমাজসংস্কারক, নতুন ব্রাহ্ম আন্দোলনের সূত্রধর,
মহিলা শিক্ষা ও ছাত্র সংগঠনের দূত, প্রথম র‌্যাংলার আনন্দমোহন বসুর মৃত‍্যুবার্ষিকীতে জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম।

তথ‍্য: মহাপুরুষদের সান্নিধ‍্যে- শিবনাথ শাস্ত্রী।

আপনার মতামত লিখুন :

 ফেসবুক পেজ

 আজকের নামাজের ওয়াক্ত শুরু

    নেত্রকোণা, ময়মনসিংহ, ঢাকা, বাংলাদেশ
    শুক্রবার, ৭ অক্টোবর, ২০২২
    ১১ Rabi' I, ১৪৪৪
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ৪:৩৭ পূর্বাহ্ণ
    সূর্যোদয়ভোর ৫:৫২ পূর্বাহ্ণ
    যোহরদুপুর ১১:৪৬ পূর্বাহ্ণ
    আছরবিকাল ৩:০৯ অপরাহ্ণ
    মাগরিবসন্ধ্যা ৫:৪০ অপরাহ্ণ
    এশা রাত ৬:৫৫ অপরাহ্ণ
এর আরও খবর
দুর্গাপুরে আবু তালহা রা: মাদ্রাসায় ২৬ জন শিক্ষার্থীর কোরআন শরীফ ছবকদান

দুর্গাপুরে আবু তালহা রা: মাদ্রাসায় ২৬ জন শিক্ষার্থীর কোরআন শরীফ ছবকদান

দুর্গাপুরে ট্রাক চাপায় পথচারি নারী নিহত

দুর্গাপুরে ট্রাক চাপায় পথচারি নারী নিহত

শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ সৃষ্টিতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী : প্রতিমন্ত্রী

শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ সৃষ্টিতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী : প্রতিমন্ত্রী

সীমান্তে অসহায় জনসাধরাণের মাঝে বিনামূল্যে ৩১ বিজিবি’র চিকিৎসা সেবা

সীমান্তে অসহায় জনসাধরাণের মাঝে বিনামূল্যে ৩১ বিজিবি’র চিকিৎসা সেবা

দুর্গাপুরে বাড়িঘর ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনায় থানায় অভিযোগ

দুর্গাপুরে বাড়িঘর ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনায় থানায় অভিযোগ

কেন্দুয়াকে আধুনিক মডেল উপজেলায় রূপান্তর করা হবে-অসীম কুমার উকিল এমপি

কেন্দুয়াকে আধুনিক মডেল উপজেলায় রূপান্তর করা হবে-অসীম কুমার উকিল এমপি

সর্বশেষ সংবাদ সর্বাধিক পঠিত
 
উপদেষ্টা সম্পাদক : দিলওয়ার খান
সম্পাদক ও প্রকাশক : মুহা. জহিরুল ইসলাম অসীম  
অস্থায়ী কার্যালয় : এআরএফবি ভবন, ময়মনসিংহ রোড, সাকুয়া বাজার, নেত্রকোণা সদর, ২৪০০ ।
ফোনঃ ০১৭৩৫ ০৭ ৪৬ ০৪, বিজ্ঞাপনঃ ০১৬৪৫ ৮৮ ৪০ ৫০
ই-মেইল : netrokonajournal@gmail.com
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।