সব
facebook netrokonajournal.com
আমার সাংবাদিকতা জীবনের শুরুর দিনগুলো: -মাসুদ করিম | নেত্রকোণা জার্নাল

আমার সাংবাদিকতা জীবনের শুরুর দিনগুলো: -মাসুদ করিম

প্রকাশের সময়:

আমার সাংবাদিকতা জীবনের শুরুর দিনগুলো: -মাসুদ করিম

নেজা ডেস্ক:
সাংবাদিকতার প্রতি প্যাশন আমার ক্যাম্পাস জীবনেরও অনেক আগে শুরু। তখন আমি নেত্রকোনা সরকারী কলেজে একাদশ শ্রেণীতে পড়ি। জেলা সদরে কলেজ হলেও আমার বাড়ি আরও ১২ কিলোমিটার দূরে বারহাট্টা থানার কদম দেউলী গ্রামে।

ট্রেনে বিনা টিকিটে কলেজে আসা; কলেজে ক্লাস শেষে বন্ধু-বান্ধব কিংবা আত্মীয়ের বাসায় মধ্যাহ্নভোজ শেষে শহরে ঘুরাঘুরি। কখনও কখনও দুপুরে না খেয়ে কিংবা রেলস্টেশন সংলগ্ন চাচার খাবার দোকানে টাকি মাছের ভর্তা ভাত খেয়ে দিন কেটেছে।

যদিও আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন সেই চাচার ভর্তাভাতের হোটেলটি আর নেই। চাচাও বেঁচে আছেন কিনা কে জানে ! তবে তাঁর ওই জীর্ণ রেস্তোরাঁয় আমার বিল বকেয়া থাকা অস্বাভাবিক নয়।

আজও নেত্রকোনা বড় রেলস্টেশনে গেলে চাচার হোটেলের জায়গাটির দিকে তাকিয়ে দেখি, বাণিজ্যিক অবয়বে ঢাকা পড়েছে সবকিছু। একদা এখানে ভর্তাভাত বিক্রি করে এক বৃদ্ধ নিজের সংসারে ভর্তাভাতের জোগান দিতেন সে কথা এখনকার প্রজন্ম জানে না।

কবিতা লেখা, দেয়াল পত্রিকা করা, সাহিত্য সংকলন মুদ্রন, পৌষমেলায় গান-নৃত্য-নাটক আয়োজনে সন্ধ্যাটা শেষ হলে রাত ১০টার ট্রেনে বাড়ি ফেরা। রাজনীতিও বাদ যায়নি।

সময়টা ছিলো এরশাদবিরোধী আন্দোলনে মুখরিত রাজপথ। স্কুল জীবন শেষে কলেজের আঙিনায় পা বাড়াতেই ‘নতুনদের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’ শ্লোগান দেখে শিহরিত হয়েছি। মিছিলে অনেকের গায়ে টি-শার্টে লেখা হেলাল হাফিজের কবিতার চিরন্তন বাণী ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’।

ছাত্র সংগঠনগুলোর কর্মীদের ফুরসৎ নেই। ভর্তি ফরম পূরন করে ভর্তির পুরো কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নবীনদের পেছনে খাটুনি। আমাকে ভিড়িয়ে ছিলো বাকশালপন্থী জাতীয় ছাত্রলীগে।

সংগঠনটি নেত্রকোনা শহরে ও কলেজ ক্যাম্পাসে শক্তিশালী। ক্যাম্পাসে জাতীয় ছাত্রলীগের সম্মেলনে আমার বক্তৃতা শোনে প্রথমবর্ষেই আমাকে কলেজ শাখার সাধারন সম্পাদক করা হয়। রাজনীতির নেশা তখন জেঁকে ধরে।

রাজনীতি, সংস্কৃতির পাশাপাশি সাংবাদিকতার প্রতিও ঝোঁক ক্রমেই বাড়তে থাকে। অধুনালুপ্ত দৈনিক আজাদে আমাদের জেলায় কোনও প্রতিনিধি ছিলো না। আমি হাতে লিখে ডাকযোগে নিউজ পাঠাতে শুরু করলাম। ‘সংবাদদাতা’ ক্রেডিট লাইনে আমার পাঠানো সংবাদ ছাপা হতে থাকে।

আমি একবার ঢাকায় এসে আজিমপুরে আজাদ অফিসে গিয়ে মফস্বল সম্পাদক আমেনা নেওয়াজির সঙ্গে দেখা করলাম। ভদ্রমহিলা আমার লেখার ভক্ত। তিনি তাই নিজের প্রকাশিত ও সম্পাদিত নারী বিষয়ক ‘ঘরনী’ নামের মাসিক ম্যাগাজিনেও লেখা পাঠাতে অনুরোধ করেন। আমি লেখা পাঠাতে থাকি। আজাদ ও ঘরনীতে ছাপা হতে থাকে। কোনও নিয়োগপত্র নেই, পারিশ্রমিক নেই।

কলেজ জীবনে রাজনীতিতে আমি একাধিকবার ছাত্র সংসদে সাহিত্য, সংস্কৃতি, পাঠাগার প্রভৃতি সম্পাদক পদে নির্বাচিত হই।

একবার রাজনীতিতে জিদাজিদি হলো। আমাদের সময়ের ভিপি নয়ন দত্ত বেশ কয়েকজনকে নিয়ে বিএনপি সমর্থিত ছাত্রদলে যোগ দিলেন। বন্ধু-বান্ধবের চাপে আমাকেও সেই গ্রুপে ছাত্রদলে যোগ দিতে হলো। আমার মনটা তখন ভীষণ খারাপ হয়েছিলো। বঙ্গবন্ধুর নামে শ্লোগান দিয়েছি। এখন নতুন শ্লোগান দিতে মাঝেমাঝে ভুল হয়ে যায়। মনের সঙ্গেও লড়াই করতে হলো। সেটা অনেক লম্বা গল্প।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর আমি খরচ চালিয়ে যাওয়া নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ি। যদিও আমার মা-বাবা আমার পড়ালেখার খরচ দিতে কার্পণ্য করেননি। বাবা ছিলেন কৃষক। মা গৃহিনী। তাঁদের আট ছেলেমেয়ে তখনও জীবিত। তার আগে আমার এক ভাই মারা গেছেন। মধ্যবিত্ত গৃহস্থ।

পরিবারের সবার পরিশ্রমে সংসার চললেও আমি পরিবারের কাছ থেকে বেশিদিন টাকা নিলে মা-বাবার ওপর চাপ পড়বে- এটা আমি বুঝতে পারি। ভর্তির পর তাই আর্থিক পরিকল্পনা করতে সময় ব্যয় হয় বেশি।

যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর বেশ কিছুদিন বাড়ি থেকে টাকা এনে পড়ালেখা করেছি। আমার মায়ের সঞ্চিত টাকা থেকে তিনি আমাকে নিয়মিত টাকা দিয়েছেন।

তারপর ঢাকায় একটা টিউশনি পাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ঢাকায় ঢাকার আরামবাগে অবস্থিত এক ব্যবসায়ীর বাসায় তার দুই মেয়েকে পড়াতে শুরু করি। ১৫ দিন পরই ক্যাম্পাসে ছাত্র-শিক্ষক বিরাট সংঘর্ষ। ক্যাম্পাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা। হল ত্যাগের নির্দেশ। আমি তখন মওলানা ভাসানী হলে থাকতাম। অগত্য ভদ্রলোককে বললাম, আমার পক্ষে টিউশনি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আমার ঢাকায় থাকার কোনও ব্যবস্থা নেই। ভদ্রলোক দুঃখপ্রকাশ করে আমাকে পাঁচশ’ টাকা দিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে কয়েক মাস লেগেছিলো।

বিশ্ববিদ্যালয় ওই সময় তিন মাসের বেশি সময় বন্ধ ছিলো। খোলার পর আবার আর্থিক ব্যবস্থার খোঁজ করি। তখন আমি ঢাকায় আমাদের এলাকার প্রতিষ্ঠিত কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ মোস্তফা জব্বারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। ওই সময়ে ‘বিজয় কী বোর্ড’ উদ্ভাবন করে তিনি প্রথম কম্পিউটারে বাংলা লেখার প্রচলন করে হইচই ফেলে দেন। তিনি বর্তমান সরকারের একজন মন্ত্রী।

মোস্তফা জব্বার আমাকে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আনন্দ কম্পিউটার্সে খন্ডকালীন চাকুরি দেন। কাজটা ছিলো কঠিন। গোটা পৃথিবীতে কম্পিউটার তথা তথ্য প্রযুক্তির যত নথি তাঁর কাছে আসে; সেগুলির অনুবাদ করা। কাজটা কঠিন এ কারণে যে, ওই সকল নথির মধ্যে বেশিরভাগ ছিলো কম্পিউটারের টেকনিক্যাল শব্দ। এগুলো বাংলা পরিভাষা তখনও হয়নি কিংবা আমার জানার বাইরে ছিলো।

তখনকার দিনে আজকের মতো গুগলে অনুবাদ করার সুযোগ ছিলো না। আমি নব্বইয়ের দশকের শুরুর সময়ের কথা বলছি। আমি ছিলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একুশতম ব্যাচের ছাত্র। নৃ-বিজ্ঞানে পড়ি।

ইন্টারনেট ওই সময়ে এত সহজলভ্য ছিলো না। মোস্তফা জব্বার তথ্য প্রযুক্তির বিদ্যায় সমৃদ্ধ ছিলেন বিধায় আমি তখনই ইয়াহুতে একটি ই-মেইল এড্রেস খুলেছিলাম। কেউ তখনও আমাকে ই-মেইল পাঠাতো না। কারন ওই সময়ে আমার পরিচিত অন্য কারও ই-মেইল এড্রেস ছিলো না।

বাংলা পরিভাষা না পেয়ে ইংরেজি শব্দটাই বাংলা হরফে লিখে জমা দিতে থাকি। জব্বার ভাই আমার অনুবাদে খুব খুশি হয়েছিলেন এমন মনে হলো না। সাংবাদিকতার প্রতি আমার ঝোঁক দেখে তিনি আমাকে তাঁর মালিকানাধীন সংবাদ সংস্থা ‘আনন্দপত্র বাংলা সংবাদ’ সংক্ষেপে আবাসে বদলী করে দেন।

আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। কারণ সাংবাদিকতার ব্যাপারটা আমার জ্ঞানের সামর্থ্যরে মধ্যে ছিলো। এটা যে শুধু নেত্রকোনা থেকে বিভিন্ন পত্রিকা ও সাময়িকীতে লেখার কারণে তা নয়। বরং তখন আমি দিনকাল পত্রিকার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসাবে যোগদান করেছি।

ঢাকার কোনও প্রতিষ্ঠিত পত্রিকার ক্যাম্পাস রিপোর্টার হিসাবে যোগদান করার কাজটা খুব সহজ ছিলো না। প্রায় সব পত্রিকায় ক্যাম্পাস রিপোর্টার ছিলো। কোনও পত্রিকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি পদটি খালি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সবার কাছ থেকে মাসের পর মাস নিউজ জমা নেয়। সেখান থেকে একজনকে সিলেক্ট করে। ওই সময়ে দিনকাল ছাড়া আর কোনও দৈনিক পত্রিকার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি পদ খালি ছিলো না। আমি প্রতিযোগিতা করে দিনকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাতিনিধি নিয়োগ পাই ঠিকই; কিন্তু এ কাজে আমার কোনও বেতন ছিলো না। ফলে ক্যাম্পাস রিপোর্টার হিসাবে কাজ করে আমার আর্থিক কোনও লাভ হলো না।

দিনকালের একজন জেষ্ঠ্য সাংবাদিক আমাকে শওকত মাহমুদের সঙ্গে দেখা করতে বললেন। শওকত মাহমুদ মিডিয়া সিন্ডিকেট নামের একটা নতুন সংবাদ সংস্থা খুলেছেন। বায়তুল মোকাররমের উত্তরে পল্টনে পাঁচ তলায় অফিস। সেখানে গিয়ে শওকত মাহমুদের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি আমাকে কয়েকটি নিউজ দিতে বলেন। আমি নিউজ দিলাম। সেগুলো মিডিয়া সিন্ডিকেটের সার্ভিসে দেয়া হলো। সংবাদ সংস্থার কাজ হলো পত্রিকা ও টিভিতে সংবাদ সরবরাহ করা।

তখনকার দিনে আজকের মতো অনলাইন নিউজ ওয়েবসাইট কিংবা ফেসবুক-টুইটারের মতো সামাজিক মাধ্যম ছিলো না। তাই মিডিয়াগুলি বার্তা সংস্থার নিউজের ওপর নির্ভরশীল ছিলো।

এভাবে আমি নিউজ দিতে থাকলাম। মিডিয়া সিন্ডিকেট ওই সকল নিউজ সার্ভিস পাঠালো। পরের দিন মিডিয়া সিন্ডিকেটের ক্রেডিট লাইন দিয়ে অনেক পত্রিকায় আমার নিউজ ছাপা হলো। আমার খুব ভালো লাগলো। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউজ শুধু নয়; বিভিন্ন ধরনের এক্সক্লুসিভ নিউজ করেছি। মাস শেষে শওকত ভাই আমাকে তিন হাজার টাকা দিলেন। সাংবাদিকতা করে আমার প্রথম উপার্জন ছিলো ওই টাকা। আনন্দে আমি অভিভূত।

আমার ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা ছিলো খন্ডকালীন। দুপুর পর্যন্ত ক্যাম্পাসে ক্লাস করি। তারপর দুপুরের দিকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছেড়ে আসা বাসে ঢাকায় গিয়ে সাংবাদিকতা। মিডিয়া সিন্ডিকেটে নিয়মিত সংবাদ দিচ্ছি। মাস শেষে টাকা পাচ্ছি।

এদিকে, সন্ধ্যায় সেগুনবাগিচায় আবাস অফিসে বসি। আবাস থেকেও মাসে তিন হাজার টাকার মতো পাই। ফলে আমার উপার্জন দাঁড়ায় ছয় হাজার টাকা।

মিডিয়া সিন্ডিকেটে বেশি রিপোর্ট দিলে বেশি টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ে খরচ তেমন বেশি না। হলের খাবারের দাম খুব কম। ডাইনিংয়ে ১০/২০ টাকার কূপন নিলে পেট ভরে খাওয়া যায়। হলের সিটের ভাড়াও সামান্য। টিউশন ফি বেশি না। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ক্যাম্পাস থেকে ঢাকায় আসার ভাড়া মাত্র এক টাকা। ফলে আমার উপার্জনের টাকায় অনায়াসে পড়ালেখার খরচ চলে যায়।

আমি এভাবে ছাত্র জীবনে একই সঙ্গে দু’টি সংবাদ সংস্থায় পুরোপুরি স্টাফ রিপোর্টার হিসাবে কাজ করেছি। পাশাপাশি পার্টটাইম ক্যাম্পাস রিপোর্টার হিসাবেও কাজ করেছি।

আবাসের মালিক পক্ষের কোনও আত্মীয়ের সঙ্গে কোনও বিষয়ে কথা কাটাকাটির কয়েক দিন পর সেখানে আমার চাকরি চলে যায়। ফলে আমার শুধু মিডিয়া সিন্ডিকেটে সাংবাদিকতা করি। এতে উপার্জন খানিকটা কমলেও চাপ অনেক কমে আসে। দু’টো চাকরি চালাতে আমার হিমশিম খেতে হচ্ছিল।

শওকত ভাই জানেন, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তাই তেমন চাপ দিতেন না। রাতে হলে ফেরার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বাসটি মিস করলে পাবলিক বাসে ফিরতে নানা সমস্যায় পড়তে হয়েছে।

এমনও দিন গেছে, গাবতলি এসে দূর পাল্লার বাসে ড্রাইভারকে অনুরোধ করে ডেইরি ফার্ম গেটে নেমেছি। হলে ফিরতে রাত দু’টো বেজে গেছে। ততক্ষনে ডাইনিং বন্ধ হয়ে গেছে। নিজেই খিচুরি রান্না করে খেয়েছি। কখনও কখনও ফার্মগেটে হলিক্রস কলেজের রোডে এক ট্রাক ড্রাইভারের অনেকটা খোলা রেস্তোরায় আমি ও অনুজ হুমায়ুন কবির (২৩তম ব্যাচ, বাংলা বিভাগ) রাতের খাবার খেতাম।

হুমায়ুন ওই সময়ে সাংবাদিকতা করলেও বর্তমানে ঢাকার একটি নামি ইংরেজি স্কুলের শিক্ষক। রেস্তোরার মালিক ভদ্রলোক অমায়িক মানুষ ছিলেন। দিনে ট্রাক চালনা। রাতে হোটেল। মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন।

আমাদের নিয়মিত খেতে দেখে ঘনিষ্ঠ হয়ে যান। আমরা তাঁকে চাচা বলে সম্বোধন করতাম। আমাদেরকে ভাল খাবার দেবার জন্যে কর্মচারিদের নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন। দাম খুব কম রাখতেন। খাবারের অনেক আইটেমের দামই ধরতেন না।

আমি স্টাফ রিপোর্টার হিসাবে কাজ করার কারণে ক্যাম্পাস জীবনে প্রেম করাটা আমার কপালে জোটেনি। কারণ বেশিরভাগ সময় আমাকে ব্যয় করতে হয়েছে ঢাকায় সাংবাদিকতা করে। তাছাড়া, যদিও আমাদের নৃবিজ্ঞান বিভাগে মেয়েদের সংখ্যা অন্যান্য বিভাগের চেয়ে বেশি ছিলো; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের সংখ্যা ছিলো অনেক কম।

এখন মেয়েদের অনেক আবাসিক হল হয়েছে। তখন মেয়েদের হলও ছিলো কম। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সম্পূর্ণ আবাসিক হওয়ায় হলে সিট না থাকলে ভর্তি করা হয় না। ফলে আমার মতো অনেক ছেলেকেই ক্যাম্পাস জীবন প্রেমহীন কাটাতে হয়েছে। ক্যাম্পাসে প্রেম করতে হলে বিকেলটা ক্যাম্পাসে কাটাতে হয়।

কিন্তু চাকুরির কারণে আমার বিকেল কিংবা সন্ধ্যা খুব কমই ক্যাম্পাসে কেটেছে। তাছাড়া, স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, মেয়েদেরকে পটানোর বিদ্যাটা আমার রপ্ত ছিলো না। কিংবা আমার সঙ্গে প্রেম করার জন্যে মেয়েদের আগ্রহ ছিলো না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে নিয়মিত যাতায়াত করার সুবাদে একটা মেয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়। আমার চেয়ে এক ব্যাচ জুনিয়র। কলা ভবনের একটি বিভাগের ছাত্রী। তখন কলা ভবন ছিলো আল-বেরুনি হলের সামনে। আমার ডিপার্টমেন্ট কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়ার কাছে সমাজ বিজ্ঞান ভবনে হওয়ায় দূরত্ব অনেক।

ফলে ক্যাম্পাসে আমাদের দেখা হওয়ার স্থান ছিলো ট্রান্সপোর্ট ডিপো যেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসগুলো ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। আমি মেয়েটির জন্যে নিয়মিত সিট রাখতাম।

মেয়েটি হলে থাকলেও ছায়ানটে গান শেখা, টিউশনি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছেলের সঙ্গে প্রেম করার জন্যে দুপুরের বাসে নিয়মিত ঢাকা যেতো। প্রেমিক ছেলেটিও মাঝেমধ্যে আমাদের ক্যাম্পাসে এসে মেয়েটির সঙ্গে সময় কাটিয়ে বেশি রাত হলে আমার রুমে থেকে যেতো।

মেয়েটি একবার আমাকে কোনও এক শুক্রবার ঢাকা না গিয়ে ক্যাম্পাসে থাকতে বললো। তখনকার দিনে শুক্রবার ক্যাম্পাস ছিলো নির্জন।

ক্যাফেটরিয়ার বারান্দায় বসে মেয়েটি আমার হাত ধরে আমার সঙ্গে প্রেমের প্রস্তাব দিলো। আমি বিস্মিত হলাম। আমি বললাম, তোমার বয়ফ্রেন্ড আছে। বয়ফ্রেন্ড আমাকে মূল্যায়ন করে না। অবহেলা করে। তার জবাব।

একটা ত্রিভুজ প্রেমে জড়িয়ে গেলাম। প্রেম গভীর হওয়ায় আগেই আমি আলটিমেটাম দিলাম। একজনকে ছাড়তে হবে। মেয়েটি তার ঢাকার বয়ফ্রেন্ডকে আলটিমেটাম দিলো। বয়ফ্রেন্ড বেচারা অবহেলার জন্যে ক্ষমা চেয়ে অভিমান ভাঙালো। মেয়েটি আমার সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙ্গে দিলো। ছ্যাকা খেয়ে নিজেকে সামলাতে আমার সময় লেগেছিলো।

মিডিয়ায় আমি হেড অফিসের স্টাফ রিপোর্টার হলেও ক্যাম্পাস রিপোর্টিং ছিলো আমার প্রাণ। ওই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষ, সিন্ডিকেট সভা, গবেষণাপত্র, আন্দোলন এসব খবর ঢাকার পত্রিকায় বেশি গুরুত্ব লাভ করতো।

ছাত্র সংগঠনগুলোর নিউজ করতে গিয়ে বিভিন্ন গ্রুপের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। শুধু ছাত্র সংগঠন নয়; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতিতেও কঠিন গ্রুপিং। একবার এক গ্রুপের ব্রিফিং নিয়ে নিউজ করার পর আরেক গ্রুপের এক শিক্ষকের তোপের মুখে পড়েছিলাম। ওই শিক্ষক আমাকে এমন ধমক দিলেন আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম।

পরে অবশ্য স্যার আমাকে স্নেহ করেছিলেন। গ্রুপিং সাংবাদিকদের মধ্যেও ছিলো। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিতে আমি সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলাম। আমাদের প্রতিপক্ষ ভোটে হেরে প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে ওঠে।

আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করে ক্যাম্পাস ত্যাগ করার পর সাংবাদিক সমিতির মেমোরি বোর্ড থেকে আমাদের নাম মুছে দেয়। এসব অনেক ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। আবার সাংবাদিকতা করার কারণে ক্যাম্পাসে ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারী সবার মধ্যে পরিচিতি পেয়েছিলাম। সেইসব অম্ল-মধুর দিন মনে পড়লে আবেগ আপ্লুত হই। সবই এখন অতীত। অতীত শুধু মধুময়।

[লেখক: চিফ রিপোর্টার, যুগান্তর।]

আপনার মতামত লিখুন :

 ফেসবুক পেজ

 আজকের নামাজের ওয়াক্ত শুরু

    নেত্রকোণা, ময়মনসিংহ, ঢাকা, বাংলাদেশ
    বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর, ২০২২
    ৯ Rabi' I, ১৪৪৪
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ৪:৩৬ পূর্বাহ্ণ
    সূর্যোদয়ভোর ৫:৫১ পূর্বাহ্ণ
    যোহরদুপুর ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ
    আছরবিকাল ৩:১০ অপরাহ্ণ
    মাগরিবসন্ধ্যা ৫:৪২ অপরাহ্ণ
    এশা রাত ৬:৫৭ অপরাহ্ণ
আমি কেন সাংবাদিক হলাম -দিলওয়ার খান

আমি কেন সাংবাদিক হলাম -দিলওয়ার খান

আমার সাংবাদিকতা জীবনের শুরুর দিনগুলো: -মাসুদ করিম

আমার সাংবাদিকতা জীবনের শুরুর দিনগুলো: -মাসুদ করিম

গণমানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলে গণমাধ্যম: দিলওয়ার খান

গণমানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলে গণমাধ্যম: দিলওয়ার খান

ঈদে আমি বিটিভিই দেখি : ফয়সাল চৌধুরী

ঈদে আমি বিটিভিই দেখি : ফয়সাল চৌধুরী

ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ: বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী

ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ: বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী

দিবস সর্বস্ব পুষ্পার্ঘ্যের মাধ্যমে ভাষার স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করা সম্ভব নয়

দিবস সর্বস্ব পুষ্পার্ঘ্যের মাধ্যমে ভাষার স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করা সম্ভব নয়

সর্বশেষ সংবাদ সর্বাধিক পঠিত
 
উপদেষ্টা সম্পাদক : দিলওয়ার খান
সম্পাদক ও প্রকাশক : মুহা. জহিরুল ইসলাম অসীম  
অস্থায়ী কার্যালয় : এআরএফবি ভবন, ময়মনসিংহ রোড, সাকুয়া বাজার, নেত্রকোণা সদর, ২৪০০ ।
ফোনঃ ০১৭৩৫ ০৭ ৪৬ ০৪, বিজ্ঞাপনঃ ০১৬৪৫ ৮৮ ৪০ ৫০
ই-মেইল : netrokonajournal@gmail.com
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।