সব
facebook netrokonajournal.com
নেত্রকোণার সম্ভাবনাময় যাত্রা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে | নেত্রকোণা জার্নাল

নেত্রকোণার সম্ভাবনাময় যাত্রা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে

প্রকাশের সময়:

নেত্রকোণার সম্ভাবনাময় যাত্রা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে

।।দিলওয়ার খান।।

যাত্রাগানের ইতিহাসে শ্রীচৈতন্যদেবের (১৪৮৬-১৫৩৩) প্রভাব ও অবদানকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এ-সময়েই যাত্রা তার শোভাযাত্রার খোলস ছেড়ে নাটমন্দিরের আঙিনায় ছড়িয়ে পড়ে। উৎসবকেন্দ্রিক পরিবেশনার বাইরে যাত্রা উপস্থিত হয় শ্রীচৈতন্যের সহজিয়া বৈষ্ণধর্ম প্রচারের মাধ্যম হিসেবে।

কিন্তু বর্তমানে নানা প্রতিবন্ধকতায় পড়ে চরম দুর্দিন পার করছে দেশের প্রাচীন শিল্প মাধ্যম ‘যাত্রা’। এ শিল্পের সাথে যুক্ত কয়েক লাখ শিল্পী ও কলাকুশলী।

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জীবন-ধারণের সব উপকরণের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের দাম সাধ‍ারণের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে।

বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষের মত যাত্রা শিল্পের সঙ্গে জড়িতরাও এই কঠোর জীবন সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছেন। এমন পরিস্থিতির কারণে শিল্পীদের কেউ কেউ অন্য পেশারও সন্ধান করছেন।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ি, দেশে বর্তমানে শিল্পী-কুশলী-কর্মচারী, দল মালিক, ব্যবস্থাপক, পালাকার, প্রদর্শক ও তাদের পরিবার পরিজনসহ যাত্রানুষ্ঠ‍ানের আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা পাঁচ লক্ষাধিক।

প্রতিটি যাত্রাদলের সদস্য সংখ্যা ৭০-৮০ জন।
এরমধ্যে শিল্পী ৫০-৫৫ জন, পুরুষের সংখ্যা ৩০-৩৫, মহিলা ১৫-১৮ জন। শিশু শিল্পী থাকে কমপক্ষে ২ জন। অবশিষ্টরা দলের বিভিন্ন দায়িত্বে সাংগঠনিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী। যাত্রাপালা একটি মৌসুমি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অর্থাৎ সারা বছর ধরে এটি অনুষ্ঠিত হয় না। পেশাদার যাত্রাপালা আয়োজনের সময়সীমা ছয় থেকে সাত মাস।

জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় ও শ্রাবণের মাঝামাঝি অর্থাৎ মে, জুন, জুলাই– এই তিন মাস আসন্ন মৌসুমের জন্য প্রত্যেক দলের সাংগঠনিক প্রস্তুতিকাল। এ সময়ে লাইসেন্স গ্রহণ, নবায়ন, পুঁজি সংগ্রহ, শিল্পী-কলাকুশলী সংগ্রহ ও চুক্তিকরণ, পালা নির্বাচন, বাক্সপেটরা, পোশাক-পরিচ্ছদ ও অন্য সামগ্রী সংগ্রহ এবং মেরামত করা হয়।

শ্রাবণের শেষ ভাগ থেকে ভাদ্রের শেষ ভাগ (আগস্ট ও সেপ্টেম্বর) যাত্রাপালার মহড়াকাল। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রার মৌসুম শুরু হয় দূর্গা পুজোর সপ্তমীর দিন থেকে। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের শেষ কিংবা অক্টোবরের প্রথম দিকে। যাত্রানুষ্ঠান আয়োজনের সমাপ্তি টানা হয় চৈত্রের শেষের দিকে অর্থাত এপ্রিলের মাঝামাঝি।

‘পেশাদার যাত্রাদলের শিল্পী-কলাকুশলীসহ সকল কর্মচারী কেবলমাত্র একটি মৌসুমের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন।

বিভিন্ন দলের চুক্তিপত্র প্রণয়নে ভিন্নতা থাকলেও চুক্তিপত্রের শর্তাবলী প্রায় ক্ষেত্রেই একই রকম। চুক্তি অনুযায়ী নায়ক-নায়িকাসহ প্রধান চরিত্রের শিল্পীদের ক্ষেত্রে দুই থেকে আড়াই মাস এবং সাধারণ মানের শিল্পীদের ক্ষেত্রে দেড় মাসের বেতন অগ্রিম দেবার প্রচলন আছে। চুক্তিপত্রের সময় সংশ্লিষ্ট শিল্পীকে সামান্য সাইনিং মানি দেয়া হয়।

সাধারণতঃ ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’-এই তিন ক্যাটাগরিতে শিল্পী এবং কলাকুশলীদের এক মৌসুমের বেতন নির্ধারণ করা হয়। কোন পালার নায়ক-নায়িকা, পরিচালকসহ প্রধান চরিত্রের শিল্পীদের ধরা হয় ‘এ’ ক্যাটাগরিতে।

প্রতি মৌসুমের জন্য তাদের প্রত্যেকের বেতন হয় ৬০-৭০ হাজার টাকা। কৌতুক অভিনেতা, সহ-অভিনেত‍াদের ধরা হয় ‘বি’ ক্যাটাগরিতে। আর তাদের বেতন ৩৫-৪০ হাজার টাকা। সাধারণ শিল্পী ও নবাগতদের ধরা হয় ‘সি’ ক্যাটাগরিতে। এই ক্যাটাগরির শিল্পীদের দেয়া হয় ২০-২৫ হাজার টাকা।

নির্ধারিত অগ্রিমের সমুদয় অর্থ পাওয়ার পর পরই শিল্পীরা নিজ নিজ দলের ‘মহড়া বাড়িতে উঠে আসেন। নতুন পালার অভিনয় এবং নৃত্যগীতের রিহার্সেল চলে টানা দেড় মাস পর্যন্ত। এই মহড়া বাড়িতে এসে দল বায়না করেন প্রদর্শকরা। যাত্রার ভাষায় যাদের বল‍া হয় ‘নায়েক পার্টি’।

গবেষণা গ্রন্থের তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে অর্ধশতাধিক পেশাদার যাত্রাদল ও শতাধিক হাফ-যাত্রা বা ঘেটুযাত্রা দল রয়েছে। পেশাদার যাত্রা দলের বাইরে এসব ছোট ছোট দলগুলোর আয়-রেজগার খুব বেশি নয়। দর্শকদের দেয়া সামান্য ‘বকসিশ’ পেয়েই খুশি এসব শিল্পীরা।

অনেক সাধারণ যাত্রা শিল্পীদের অভিযোগ- নায়েক পার্টির কাছ থেকে অধিক পরিমাণ অর্থ নেয়া হলেও সংশ্লিষ্ট পালা মালিক বা পরিচালক পারিশ্রমিক দেয়ার ক্ষেত্রে সুবিচার করেন না। কেন্দ্রীয় চরিত্রের শিল্পীদের পারিশ্রমিক দেয়ার পর সাধারণ শিল্পীদের অতি সামান্য টাকা দেয়া হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব কিছুর দাম বাড়লেও যাত্রাশিল্পীদের রোজগার বাড়েনি। এর ফলে দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে তাদের জীবনযাত্রা। কেবল আর্থিক নিরাপত্তার কথা ভেবেই অনেক পেশাদার যাত্রাশিল্পী বিকল্প পেশায়ও চলে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই কম বেশি যাত্রাদল রয়েছে। তবে পেশাদার যাত্রাদলের বেশির ভাগই শহর কেন্দ্রীক। এসব যাত্রাদল প্রদর্শক বা আয়োজকদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করে থাকেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আয়োজকরা পাল‍া মঞ্চায়নের জন্য যাত্রা পরিচালক বা মালিকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন।

যাত্রা মালিকের সঙ্গে কথা পাকাপাকি করেই পালা আয়োজনের বাকি কাজ শুরু করেন আয়োজক পক্ষ। যাত্রাদলের কোন সদস্যের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রে পালা প্রধান ছাড়াও অন্যকোন শিল্পীর মাধ্যমেও হতে পারে এ চুক্তি। যাত্রা শিল্পীদের একাধিক সংগঠনও রয়েছে। এসব সংগঠনের নেতৃবৃন্দের মাধ্যমেও পালা মঞ্চায়নের চুক্তি হয়ে থাকে।

মৌখিক ও লিখিত দু’ভাবেই আয়োজকদের সঙ্গে যাত্রাপালার চুক্তি হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মৌখিক চুক্তিতেই অভিনয়ে সম্মত হয় যাত্রাশিল্পীরা। তবে এক্ষেত্রে অগ্রিম পারিশ্রমিক নেয়ার বিধান চালু রয়েছে।

উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় শহর এবং জাতীয় পর্যায়ে যাত্রাশিল্পীদের সংগঠনের অফিসে এসেও পালা মঞ্চায়নের জন্য পছন্দের দল বাছাই করতে পারেন আয়োজকরা।

এদিকে নেত্রকোণা জেলায় রয়েছে প্রায় ৬ টি নিবন্ধিত যাত্রা দল। বাংলাদেশ যাত্রা ফেডারেশন নেত্রকোনা জেলা কমিটির সভাপতি মির্জা আব্দুল কুদ্দুস জানান, নেত্রকোনা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৬৫ থেকে ৭০ টি পরিবার পেশাদার যাত্রা শিল্পে কাজ করে। এই পরিবারগুলোর সাথে জড়িত হচ্ছে দুই থেকে আড়াইশ সদস্য। ২০২০ সালের করোনা দুর্যোগে চরম দূর্বিষহ অবস্থায় রয়েছে তারা। না পারছে অন্য পেশায় ঢুকতে না পা পারছে এই পেশায় কাজ করতে। কোভিড-১৯ মহামারীতে নেত্রকোনা জেলা প্রশাসন কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে গৃহবন্দি যাত্রাশিল্পীদের নানা প্রণোদনা দিয়েছে (৫১জন শিল্পী এর মধ্যে যাত্রা শিল্পী ৩১জন পেয়েছে ৫০০০ টাকা করে প্রণোদনা করে ৫৫ যাত্রা শিল্পীকে ১০০০টাকা করে প্রণোদনা দিয়েছে জেলাপ্রশাসক)। যদিও তা ছিল চাহিদার তুলনায় যৎসামান্য। আমাদের নেত্রকোনার প্রাচীন ঐতিহ্য আমাদের সম্ভাবনাময় যাত্রা শিল্পকে, আমাদের সংস্কৃতিটাকে বাঁচিয়ে রাখতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নেত্রকোনা জেলা প্রশাসকের সহযোগিতায় এই অসহায় যাত্রাশিল্পীদের তাদের শিল্পকলাকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে এই কলাকুশলীদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা প্রয়োজনে। তাদের মৌসুমী বেকারত্ব থেকে অর্থাৎ বছরে যে সময় কোন অভিনয় থাকেনা, কোন যাত্রা মঞ্চ থাকে না সেই সময়টাতে তাদেরকে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে অন্য পেশায় যেন কাজ করতে পারে। এতে করে তাদের পরিবারের ভরণ পোষণের একটা স্থায়ী সমাধান চলে আসবে। আমরা জানি বেশকিছু যাত্রাশিল্পী যারা নেত্রকোনা জেলাকে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন তারা আজকে অসহায় অবস্থায় দিনাতিপাত করছে, এমনকি দুইজন যাত্রাশিল্পী স্ট্রোক করেছে একজন মারা গেছেন (মীরা মমতাজ) সুরভী নামের অন্য একজন স্ট্রোক করে অসুস্থ অবস্থায় রয়েছে। জেলার একটি যাত্রাশিল্পী মেয়ে আত্মহত্যা করেছে।

সামাজিক ভাবেও এই গুণি শিল্পীদের হেয় করে দেখা হয়, ফলে তারা,অন্য পেশায়ও মুখ করতে পারেনা।

জেলার স্বেচ্ছাসেবীদের বৃহৎ সংগঠন আব্দুর রহমান ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ নামের একটি বেসরকারি সংস্থা এমন অসহায় ১৫ জন শিল্পীর দ্বায়িত্ব নিয়েছেন যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় কাজ। তাই আমাদের উচিৎ প্রত্যেকের অবস্থান থেকে এই শিল্পীদের জন্য কাজ করে যাওয়া।

[জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও চেয়ারম্যান এ আর এফ বি]

আপনার মতামত লিখুন :

 ফেসবুক পেজ

 আজকের নামাজের ওয়াক্ত শুরু

    নেত্রকোণা, ময়মনসিংহ, ঢাকা, বাংলাদেশ
    শুক্রবার, ৭ অক্টোবর, ২০২২
    ১০ Rabi' I, ১৪৪৪
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ৪:৩৭ পূর্বাহ্ণ
    সূর্যোদয়ভোর ৫:৫২ পূর্বাহ্ণ
    যোহরদুপুর ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ
    আছরবিকাল ৩:০৯ অপরাহ্ণ
    মাগরিবসন্ধ্যা ৫:৪১ অপরাহ্ণ
    এশা রাত ৬:৫৬ অপরাহ্ণ
নেত্রকোণার সামাজিক ঐতিহ্য —মঈনউল ইসলাম

নেত্রকোণার সামাজিক ঐতিহ্য —মঈনউল ইসলাম

নেত্রকোণা প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের সহায়ক উপকরন বিতরণ

নেত্রকোণা প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের সহায়ক উপকরন বিতরণ

নেত্রকোণা সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক এপর্যন্ত ১২৩৩জন রোগীকে মোট ৬কোটি ১৬ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার চিকিৎসা সহায়তা প্রদান

নেত্রকোণা সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক এপর্যন্ত ১২৩৩জন রোগীকে মোট ৬কোটি ১৬ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার চিকিৎসা সহায়তা প্রদান

পজিটিভ নেত্রকোণা-১৯, যুবরাই পারবে সংকট দূর করতে

পজিটিভ নেত্রকোণা-১৯, যুবরাই পারবে সংকট দূর করতে

নেত্রকোণা জেলা শিক্ষা প্রকৌশল ৩২৬ কোটি ৪৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার অবকাঠামো নির্মাণ করছে

নেত্রকোণা জেলা শিক্ষা প্রকৌশল ৩২৬ কোটি ৪৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার অবকাঠামো নির্মাণ করছে

পজেটিভ নেত্রকোণা: সংস্কৃতিক শিল্পিদের সহায়তায় নজির রেখেছেন জেলা প্রশাসক কাজি মোঃ আব্দুর রহমান

পজেটিভ নেত্রকোণা: সংস্কৃতিক শিল্পিদের সহায়তায় নজির রেখেছেন জেলা প্রশাসক কাজি মোঃ আব্দুর রহমান

সর্বশেষ সংবাদ সর্বাধিক পঠিত
 
উপদেষ্টা সম্পাদক : দিলওয়ার খান
সম্পাদক ও প্রকাশক : মুহা. জহিরুল ইসলাম অসীম  
অস্থায়ী কার্যালয় : এআরএফবি ভবন, ময়মনসিংহ রোড, সাকুয়া বাজার, নেত্রকোণা সদর, ২৪০০ ।
ফোনঃ ০১৭৩৫ ০৭ ৪৬ ০৪, বিজ্ঞাপনঃ ০১৬৪৫ ৮৮ ৪০ ৫০
ই-মেইল : netrokonajournal@gmail.com
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।