সব
facebook netrokonajournal.com
নেত্রকোণার সামাজিক ঐতিহ্য ---মঈনউল ইসলাম | নেত্রকোণা জার্নাল
প্রকাশের সময়:

নেত্রকোণার সামাজিক ঐতিহ্য —মঈনউল ইসলাম নেত্রকোণার সামাজিক ঐতিহ্য: মঈনউল ইসলাম

প্রাণীজগতের প্রত্যেক প্রজাতিরই একটি নিজস্ব সমাজব্যবস্থা এবং কিছু রীতি, প্রথা, ঐতিহ্য রয়েছে। মানব সমাজের এই নিয়মের সঙ্গে মানবজীবনের প্রতিটি কার্যক্রম মিলেই সংস্কৃতি। ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ বইয়ে গোলাম মুরশিদ বলেন ‘ভাষা, সাহিত্য, ধারণা, ধর্ম ও বিশ্বাস; রীতিনীতি, সামাজিক মূল্যবোধ ও নিয়মকানুন; উৎসব ও পার্বণ; শিল্পকর্ম; এবং প্রতিদিনের কাজে লাগে এমন হাতিয়ার ইত্যাদি সব কিছু নিয়েই সংস্কৃতি। সমাজের সদস্য হিসেবে মানুষ যেসব শিক্ষা, সামর্থ্য এবং অভ্যাস আয়ত্ত করে-তাও সংস্কৃতির অঙ্গ’। সৈয়দ মুজতবা আলীর মতামতেও একই বিষয় প্রতিধ্বনিত হয়। ‘বাংলাদেশের কালচার’ বইয়ে তিনি যুগযুগ ধরে একত্রে বসবাস করা গ্রামীণ মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, হাসি-কান্না, আচার-ব্যবহার, পোশাক-পরিচ্ছদ, চিন্তা-ভাবনা, প্রথা-সংস্কার, কাহিনি-কিংবদন্তী, এমনকি ভূত-প্রেত দর্শন-শ্রবণ তথা সামাজিক আচারের সমষ্টিকেই জাতির কালচার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। উদাহরণের মাধ্যমে তিনি বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করেছেন এইভাবে- ‘আবাসগৃহ নির্মাণ সভ্যতা। কিন্তু স্থাপত্যের রূপ কী হইবে, দালান-ইমারত চূড়াওয়ালা বা গম্বুজওয়ালা হইবে, না চৌকোনা বা চ্যাপটা হইবে, ইট-পাথরের হইবে না কাঠ-বাঁশের হইবে-এ সব কালচারের ব্যাপার’।

গোলাম মুরশিদের মতে ভারতবর্ষের যে-অঞ্চলে আর্যরা প্রথম বসতি স্থাপন করেছিলো সেই স্থান এবং ভারতবর্ষের শাসনকেন্দ্র দিল্লি থেকে বাংলাদেশের অবস্থান হাজার মাইলেরও বেশি দূরত্বে। অধিকন্তু প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে এই অঞ্চলের সঙ্গে কেন্দ্রের যোগাযোগ ছিলো খুবই শিথিল। সে কারণে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ছিলো আর্য-সংস্কৃতির প্রভাবমুক্ত। আবার বাংলার মধ্যেও নেত্রকোণা ছিলো গারো পাহাড়ের পাদদেশে, হাওড় বিধৌত, ঘন জঙ্গলাকীর্ণ অনুদ্ঘাটিত এক জনপদ, লুকানো সম্পদের ভাণ্ডার। Life in The Mufassil or, The Civilian in Lower Bengal (Vol-II) গ্রন্থে ময়মনসিংহের তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উল্লেখ করেছেন যে একবার শিকারে গিয়ে তিনি প্রায় একশ মাইলের অধিক সফর করলেও এর মধ্যে কোনো রাস্তার অস্তিত্ব খুঁজে পাননি। আবার কোনো কোনো লেখক দুর্গাপুর এলাকায় ‘অসভ্য জাতি’র বসবাস সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন। ‘অসভ্য’ বলতে মূলত বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগহীনতাকে বোঝানো হয়েছে। উল্লিখিত আলোচনার ধারাবাহিকতায় এ কথা স্পষ্ট যে, প্রকৃতির আপন খেয়ালে বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন নেত্রকোণার সংস্কৃতি বেড়ে উঠেছে একেবারেই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে। বিস্তৃত হয়েছে নাড়ির গভীরে।

প্রাচীনতম সামাজিক একক ‘পরিবার’ বা ‘ঘর’ হলো সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ। ‘পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে’ একটু শান্তি, একটু বিশ্রামের আশায় মানুষ ঘরে ফিরে আসে। নতুন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঘর থেকেই নতুন উদ্যমে শুরু করে নতুন জীবনযুদ্ধ। নেত্রকোণায় এক সময় প্রচলিত ‘জুইতের ঘর’ ময়মনসিংহ গীতিকাকে করেছে সমৃদ্ধ। বাংলা একাডেমির অভিধানে ‘জুইত’ শব্দের সরাসরি কোনো অর্থ নেই। স্থানভেদে শব্দটি ‘আরামদায়ক’ বা ‘হাউস’ অর্থাৎ ‘শখ’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে, অভিধানে নেত্রকোণা অঞ্চলে অনেক পূর্বে বিদ্যমান অর্ধচন্দ্রাকৃতির চালবিশিষ্ট এক ধরনের ঘরকে ‘জুইতের ঘর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আগের দিনে এ অঞ্চলে প্রচুর জুইতের ঘর নির্মিত হতো। মহুয়া পালার ঠাকুর নদের চাঁদের নিকট থেকে উলুয়াকান্দায় থাকার জায়গা পেয়ে খুশি হয়ে হোমরা বাইদ্যা ‘জুইতের ঘর’ বেঁধেছিল। বহু দরদে নির্মিত সেই ঘর ছিলো খনার বচনের ‘দক্ষিণ-দুয়ারী ঘরের রাজা’-এর একান্ত প্রতিরূপ। ‘সুখের নিদ্রা’ যাওয়ার জন্য এমন ঘরইতো দরকার। ড. দীনেশচন্দ্র সেন লিখেছেন- ‘জুইতের ঘর শব্দের অর্থ আমি ভাবিয়াছিলাম ‘সুসজ্জিত বাড়ি’ কিন্তু দেখিতেছি, উহার একটি স্থানীয় অর্থ রহিয়াছে। অমূল্যবাবু বলেন যে উহা একপ্রকার ‘বাঙ্গালা ঘর’-কে বুঝায়। তিনি ঐরূপ বাড়ির একটি ছবিও আঁকিয়া পাঠাইয়াছেন এবং তাহা হইতে বুঝিতে পারি যে উহা পূর্বকালীন খিলানওয়ালা একপ্রকার মন্দিরের মতো গৃহ’।

নেত্রকোণার পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসরত গারোদের বাসগৃহ এই অঞ্চলের আরেক ঐতিহ্য। পাহাড়ি ও বনাঞ্চলে গারোদের আদিবাস হওয়ায় জঙ্গলের জন্তু-জানোয়ারের হাত থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য তাঁরা গাছের ওপর ঘর অর্থাৎ ‘বোরাং’ তৈরি করতো। সময়ের পরিক্রমায় অধিক জনসংখ্যার বসতি তৈরির নিমিত্ত মানুষের নির্বিচার আক্রমণে ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায় বনভূমি ও বন্যপ্রাণী। গারোরা তাঁদের শতবর্ষীয় অবস্থান ছেড়ে নিচের উপত্যাকা বা সমতলভূমিতে সড়ে আসতে বাধ্য হয়। তবে, শূন্যে ভাসমান থাকার অনুভূতি গ্রহণের অভ্যাস ত্যাগ করেনি পুরোপুরি। সমতলে হলেও পাহাড়ের পাদদেশে বাঁশ এবং কাঠের খুঁটির ওপর তৈরি মাচায় নির্মিত ঘর, ‘বোরাং’ এর পরিবর্তে হয়ে যায় ‘মাচাং’। মাচাং-এ বসবাসের কারণে পাহাড়ি ঢলে ঘরের মধ্যে পানি ও বালু ঢুকে পড়ার আশঙ্কা কম। পরিবারের সকল সদস্যদের নিয়ে একত্রে বসবাসের সুবিধার্থে মাচাংগুলো একটু লম্বা প্রকৃতির হয়। তবে, ঝড়ো বাতাসের কবল থেকে নিরাপদ থাকার জন্য খুঁটির ওপর থেকে বেশি উঁচু হয় না। গারোদের এই সামাজিক আচরণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় জ্ঞান (indigenous knowledge)-এর উপযোগীতার অনবদ্য প্রমাণ।

আকৃতি, সংস্কার এবং অবস্থানের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ঘর হয়েছে ঐতিহ্যের বিষয়। চৌদ্দ শতকে নির্মিত ইটালির ‘ট্রুলো’ ঘর ইউনেস্কো ঘোষিত একটি বিশ্ব ঐতিহ্য। এর গম্বুজাকৃতির ছাদের অংশটি দেখতে অনেকটা পিরামিড অথবা আমাদের বহুল পরিচিত চালকলের উল্টো করে রাখা কাপের (অর্থাৎ যে অংশে ধান ঢালা হয়) মতো। উল্লেখ্য ট্রুলোর ছাদে চুনকাম করা হয় দুর্ভাগ্যের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। অপরদিকে, তুরস্কের জেরোম জাতীয় উদ্যানের ‘রূপকথার ধুম্রনালী’ (fairy chimneys) নামে পরিচিত অদ্ভূত দর্শন পাথুরে ভূ-প্রকৃতিতে অবস্থিত ‘ভূগর্ভস্থ শহর’ (troglodyte towns) আরও একটি বিশ্ব ঐতিহ্য। যুদ্ধ ও ধর্মীয় হত্যাযজ্ঞ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পলাতক মানুষেরা বাহ্যিকভাবে রুক্ষদর্শন এই পাথুরে আবরণ খনন করে গুহাঘরে বসতি স্থাপন করেছে সেই চতুর্থ শতকে। টানেল দ্বারা যুক্ত এই ট্রগ্​লোডাইট শহর এখন পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ।

হাওড়ের আশির্বাদপুষ্ট নেত্রকোণার দুটি অন্যতম সম্পদ হলো হাওড়ের মাছ এবং বোরো ধান। তাই, মাছ ধরা বা হাওড় কেন্দ্রিক কোনো উৎসব বা ঐতিহ্য থাকা খুবই কাঙ্ক্ষিত। হাওড়বাসীর একসময়ের প্রাণের উৎসব ছিলো ‘বিল বাওয়া’। ‘বিল বাওয়া বা পলো উৎসব’ বলতে মাছ ধরার মৌসুমে উৎসবমুখরতার সঙ্গে দল বেঁধে কোনো বিলের মাছ ধরাকে বুঝায়। তারিখ নির্ধারণপূর্বক অথবা বছরের নির্দিষ্ট দিনে মাছ ধরার জন্য হাট-বাজারে ঢোল-শোহরত করা হতো। ঘোষণা অনুযায়ী দূর-দূরান্ত থেকে উৎসাহী মানুষ তাঁদের মাছ ধরার উপকরণ নিয়ে আগের রাতে বিল পাড়ে অথবা নিকটবর্তী আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে অবস্থান করতেন। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে মাছ শিকারিরা একযোগে হৈ হৈ করে বিলের পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়তো। সময়ের পরিক্রমায় নেত্রকোণার এই উৎসব এখন হারিয়ে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে। জলমহাল বা বিলের ইজারাদার লোকসানের আশঙ্কায় পাহাড়া বসায় এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনির সহায়তা নিয়ে মাছ রক্ষায় ব্রতী হয়। তবুও কোনো কোনো রাতে বিল বাওয়ার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে ‘পলো পার্টি’ একত্রিত হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে তখন প্রশাসন ও পুলিশকে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হয়। এই সমস্যা থেকে উত্তোরণ এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যকে সংরক্ষণের স্বার্থে হাওড়-উপজেলাসমূহের একটি করে বিল ‘বিল বাওয়া উৎসব’ আয়োজনের জন্য সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। আবার গ্রামবাসী একত্রিত হয়েও একটি বিল ইজারাগ্রহণপূর্বক সংরক্ষণ করতে পারে।

এই বিল বাওয়া উৎসবের মধ্যেও রয়েছে শৃঙ্খলা বা নিয়মতান্ত্রিকতা, গণতন্ত্র, দলবদ্ধভাবে কাজ করা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অনন্য উদাহরণ। সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার গোয়াহারি গ্রামের বড় বিলে প্রায় দুইশত বছর যাবৎ চলছে ঐতিহ্যবাহী পলো বাওয়া উৎসব। গ্রামের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে ভাদ্র মাসে এই বিলের মাছ ধরা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং মাঘ মাসের প্রথম দিনে আয়োজন করা হয় এই দক্ষযজ্ঞের। নির্ধারিত দিনের এক সপ্তাহ পূর্বে গ্রামবাসী সভা করে মাছ ধরা শুরুর সময়, মেয়াদ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা প্রভৃতি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। গ্রামের বাইরের কেউ এই মাছ ধরায় অংশগ্রহণ করতে পারে না। এই সময়ে সমস্ত গ্রাম জুড়ে উৎসবের আমেজ বিরাজ করে।

দলবদ্ধভাবে কাজ করার আরও একটি ঐতিহ্য হলো ‘দাওয়ামারী উৎসব’। ধানকাটা শুরু বা নবান্নের উৎসব খুবই সাধারণ একটি ঘটনা হলেও ধানকাটা সমাপ্তির উৎসব বিরল। ‘দাওয়ামারী উৎসব’ নামক অভূতপূর্ব একটি উৎসব প্রচলিত ছিলো নেত্রকোণার হাওড়াঞ্চলে। স্থানীয় ভাষায় ‘দাওয়া’ অর্থাৎ ‘কাটা’ এবং ‘মারী’ অর্থাৎ ‘মেরে ফেলা’ বা ‘শেষ করে দেওয়া’; অর্থাৎ ধানকাটা সমাপ্তির উৎসব। হাওড়াঞ্চলে ধানকাটা সমাপ্ত হলে বা শেষের দিকে গ্রামবাসীদের সমবেত আয়োজনে গৃহস্থ বাড়ির বউ-ঝি’রা নতুন ধানের চালে পিঠা, পায়েস, ক্ষীরসহ নানারকম সুস্বাদু, মুখরোচক খাবার তৈরি করতো। মাঠ থেকে ফেরা চাষিরা অথবা কখনও কখনও মাঠে বসেই সবাই মিলে এই খাবার খাওয়া হতো মজা করে। সেখানে থাকত গান-বাজনা ও খেলাধুলাসহ বিভিন্ন আনন্দ-আয়োজন। শ্রমিক সংকট এবং কৃষির যান্ত্রিকায়নের সুতীব্র আক্রমণে গ্রামীণ মানুষের জীবনে প্রবেশ করেছে শহুরে রুক্ষতা; আর হারাতে চলেছে গ্রাম-বাংলার জীবনঘনিষ্ঠ নানাবিধ ঐতিহ্য।

বিলবাওয়া বা পলো উৎসব এবং দাওয়ামারী উৎসব হলো দলগত কাজের উদাহরণ। নাটোর জেলার হুলহুলিয়া গ্রামের অধিবাসীদের ঐক্য সৃষ্টি করেছে অনন্য নজির। গ্রামের কোনো সমস্যাকে প্রত্যেকেই নিজের সমস্যা মনে করে এবং একত্রিত হয়ে সমাধান করে। ফলে এই গ্রামে নেই কোনো হানাহানি, বিশৃঙ্খলা বা মামলা-মোকদ্দমা; বরং গ্রামের সাম্য ও একাত্মতা হয়েছে নজিরবিহীন। এই ভালো অভ্যাসগুলোর চর্চা যুগ যুগ ধরে সেখানে মানবিক মানুষ তৈরি করছে। এজন্য বৃহত্তর স্বার্থে শিক্ষণীয় এই সামাজিক প্রথাকে বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন।

ভাওয়াল গড় থেকে শুরু করে পূর্ব-উত্তর ময়মনসিংহ এলাকা তথা শেরপুর ও নেত্রকোণা ছিলো জঙ্গলাকীর্ণ। এই অরণ্যে ছিলো শ্বাপদসংকুল। বয়স্কদের মুখে শোনা যায় যে, নেত্রকোণার পাহাড়ি এলাকায় একসময় প্রচুর বাঘের বিচরণ ছিলো। তবে, এই এলাকার লোকসাহিত্যে বাঘের উপস্থিতি কিংবা বাঘ সম্পর্কিত কল্পকাহিনি খুব-একটা পাওয়া যায় না। ময়মনসিংহের তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক লিখিত এবং ১৮৭৮ সালে প্রকাশিত Life in The Mufassil or, The Civilian in Lower Bengal (Vol-II) বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘Mymensingh swarms with leopards’, অর্থাৎ ময়মনসিংহ এলাকায় প্রচুর বাঘ রয়েছে। বাঘগুলো প্রায়শ খাবারের খোঁজে জনপদে নেমে আসত। দায়িত্বপালনের কোনো এক ডিসেম্বরে তিনি গারো পাহাড়ের পাদদেশে শিকার করছিলেন (উল্লেখ্য সেখানেও তিনি একটি বাঘ শিকার করেন)। সফরে থাকা অবস্থায় তিনি সুসং-রাজার নিকট থেকে জনপদে নেমে আসা একটি বাঘ শিকারের আমন্ত্রণ পান। সুসং পৌঁছে দেখেন দুর্গাপুরের নিকটেই ছোটপরিসর কিন্তু ঘন একটি পাহাড়ি জঙ্গলের মধ্যে একটি বাঘ আটকা পড়েছে বা আটকে রাখা হয়েছে। জঙ্গলের উত্তর-পশ্চিম দিকে জাল দিয়ে এবং দক্ষিণাংশে গ্রামবাসীরা জড়ো হয়ে ঘিরে রেখেছে জায়গাটিকে। বাঘটিকে তাড়িয়ে কোনঠাসা করে লোহার রডে তৈরি বাক্সে বন্দি করার পরিকল্পনা থাকলেও ব্যর্থ হয়ে বাঘটিকে গুলিকরে হত্যা করা হয়। পরদিন সেখানে থাকাবস্থায় নিকটবর্তী অন্য এক স্থানে আরও একটি বাঘের জনপদে চলে আসার খবর পান। লোকালয়ে নেমে আসা বাঘের আক্রমণ থেকে নিজেদের জীবন ও গবাদিপশুকে রক্ষার জন্য স্থানীয় অধিবাসীগণ ‘বাঘাই ব্রত’ বা ‘বাঘব্রাত্য’ বা ‘বাঘের সিন্নি’ মানত বা পালন করতো।

অভিধান অনুযায়ী ‘ব্রত’ অর্থ পুণ্য অর্জনের মনোবাসনা, ধর্মকর্ম, কঠোর তপস্যা। অপরদিকে, ‘ব্রাত্য’ অর্থ হলো পতিত, নিন্দিত বা ব্রতভ্রষ্ট। অর্থাৎ বাঘাই ব্রত বা বাঘব্রাত্য অর্থাৎ মানুষের ও গবাদি পশুর জীবন রক্ষার জন্য বাঘের অনুগ্রহ লাভ অথবা বাঘকে তার লক্ষ্যভ্রষ্ট করার নিমিত্ত কঠোর তপস্যা। একসময় নেত্রকোণার গৃহস্থ পরিবারের মধ্যে বাঘাই ব্রত পালন একটি দৈনন্দিন অনুষঙ্গ ছিলো। হাওড়াঞ্চলের হিন্দু সম্প্রদায় এই সিন্নিকে ‘দক্ষিণা রায়ের পূজা’ এবং মুসলমানগণ ‘গাজী সাহেব’ ও ‘শারপীন’-কে বাঘের পীর বলে মনে করতো। তবে, কখনও কখনও গ্রামের হিন্দু-মুসলমান একত্রিত হয়ে গ্রামের সকল পরিবার থেকে চাল, গুড়, দুধ ও টাকা সংগ্রহ করে এই সিন্নির আয়োজন করতো। বাঘ না থাকায় নেত্রকোণা অঞ্চল থেকে এই প্রথা এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

এমনই এক লোকগাঁথা প্রচলিত রয়েছে বাদা তথা সুন্দরবন অঞ্চলে বসবাসকারী জেলে, বাওয়াল ও মৌয়ালদের মধ্যে। সেখানে রয়েছে সুন্দরবনের সুরক্ষা প্রদানকারী ‘গাজী পীর’ কিংবা ‘বনবিবি’ এবং বাঘরূপী খলনায়ক বা অপশক্তি ‘দক্ষিণা রায়’। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী বহু বছর পূর্বে সুন্দরবনের পাশের গ্রামে বাস করতো গরীব এক মা ও তাঁর শিশু সন্তান দুঃখু। জীবিকার তাগিদে শিশু দুঃখুকে মধু-ব্যবসায়ী ধোনাই-মোনাই-এর সঙ্গে মধু সংগ্রহ করতে সুন্দরবনে পাঠায় তাঁর মা। বিদায় বেলা মা দুঃখুকে স্মরণ করিয়ে দেন যে ‘আমার মতো তোর আরেক মা রয়েছেন বনে। বিপদে পড়লে তাঁকে ডাকবি’। সুন্দরবনে থাকাবস্থায় এক রাতে ধোনাই-মোনাইয়ের স্বপ্নে হাজির হয়ে দক্ষিণারায় শিশু দুঃখুকে উৎসর্গ করার নির্দেশ দেন; অন্যথায় তাঁদের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান হওয়ার হুশিঁয়ারি উচ্চারণ করেন। দক্ষিণারায়ের হুমকিতে ভীত হয়ে শিশু দুঃখুকে জঙ্গলের মধ্যে পাঠিয়ে নৌকা নিয়ে ধোনাই-মোনাই কেটে পড়ে। বিপন্ন দুঃখুর মনে পড়ে যায় মায়ের উপদেশ। সাহায্য চায় বনবিবির। দুঃখুর প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে অপশক্তি দক্ষিণারায়ের হাত থেকে বাঁচিয়ে অনেক সম্পদসহ তাঁকে বাড়তে পৌঁছে দেয় বনবিবি। সাক্ষাৎ মৃত্যুর কবল থেকে মুক্তি পাওয়ায় গলায় কুঠার বেঁধে ভিক্ষা করে দুঃখু। সংগৃহীত উপকরণ দিয়ে বনবিবির পূজা শুরু করে। বাদা’র ওপর নির্ভরশীল মানুষদের মধ্যে সেই থেকে চলছে বনবিবির পূজা। তবে, কোথাও কোথাও গাজী পীরের জন্য মানত করে নতুন গামছায় ‘গিট’ বা ‘গেড়ো’ বেঁধে সঙ্গে নিয়ে ঢুকে পড়ে সুন্দরবনের ভিতর। আশা দক্ষিণারায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলেও গামছায় গেড়ো থাকার কারণে তিনি মুখ খুলতে পারবেন না। আর সেই সুযোগে জীবন নিয়ে ফিরে আসতে পারবে মৌয়াল, বাওয়াল বা জেলেরা।

নেত্রকোণার আরেকটি লুপ্তপ্রায় প্রথার নাম ‘কেষকামলা’। ‘কেষ’ শব্দের আনুষ্ঠানিক কোনো অর্থ না থাকলেও ‘কামলা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘দিনমজুর’। তবে, ‘কেষকামলা’ বলতে এক ধরনের শ্রমিক বা দিনমজুরকে বোঝায় যারা মজুরি ছাড়া অন্যের কাজ করে দেয়। কোথাও কোথাও এই কাজকে ‘বেগাড় খাটা’ বা ‘বেগাড় দেওয়া’ বলা হয়। মাঠে ধান রোপণ কিংবা পাকা ধান কাটার সময় কোনো কোনো গৃহস্থ নিকটবর্তী গৃহস্থ-চাষি ও শ্রমিকদের আমন্ত্রণ জানাতেন কেষকামলার জন্য। সঙ্গে গৃহস্থের বাড়িতে থাকত ব্যাপক খাবারের আয়োজন। যেহেতু এই কাজের বিনিময়ে কোনো মজুরি বিনিময় হয় না, সেহেতু মন-পছন্দ খাবার আয়োজনে গৃহস্থের বিশেষ নজর থাকত। কেষকামলারা মনের আনন্দে মাঠে কাজ করতো, ফলে কাজের মান ও পরিমাণ হতো খুবই দৃশ্যমান। বিষয়টি উৎপাদনের খুবই স্বীকৃত একটি তত্ত্ব ‘কর্মীরা যত সুখী ও স্বতঃস্ফূর্ত হবে, কাজও ততো ভালো এবং বেশি হবে’-এর মাঠ পর্যায়ে বাস্তব প্রয়োগের চমৎকার উদাহরণ। কেষকামলা প্রথা সামাজিক সম্প্রীতি, সৌহার্দ ও সহযোগিতার অনন্য নজির। এই অনন্য সামাজিক আচরণ প্রজন্মান্তরে পারস্পরিক সহযোগিতা বা মহানুভবতার মতো মানবিক গুণাবলির শিক্ষা দেয়।

পরার্থপরতা ও মহানুভবতার এমন নিদর্শন বা আচরণ ছড়িয়ে রয়েছে দুনিয়া জুড়ে বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর ঐতিহ্যে, বিভিন্ন সমাজের সামাজিকতায়। The Human Generosity Project-এর গবেষকগণ একমত হয়েছেন যে, ‘যে সমাজে এই মহানুভবতার চর্চা যত বেশি, সংকটময় পরিস্থিতিতে তাদের টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি’। পরোপকারীতার এই সামাজিক আচরণকে কোথাও কোথাও এক ধরনের ‘বিমা’ (insurance) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঞ্জানিয়া ও কেনিয়ার মাসাই গোত্রের রাখালেরা তাঁদের গোত্রের সদস্যদের (osotua network) কারও গরু বা মহিষের পাল মড়ক লেগে ধ্বংস কিংবা ডাকাতি হয়ে গেলে অন্যরা তাঁদের পাল থেকে গরু বা মহিষ ধার দেয়। মজার ব্যাপার হলো এই ধার কখনও শোধ করতে হয় না। বন্ধুর বিপদে আজ যেমন তারা সাহায্য করতে পারল, ভবিষ্যতে তাঁর দুর্দিনে ঐ বন্ধু হয়তো সাহায্যে এগিয়ে আসবে বলে তাঁদের বিশ্বাস। ফিজিতে এই অভ্যাস কেয়ারিকেয়ারি (kerekere) এবং দক্ষিণ-পশ্চিম আমেরিকার র​্যাঞ্চারদের মধ্যে (neighboring) নামে পরিচিত। ‘সবাই মিলে বেঁচে থাকাতেই আনন্দ’-এই মূলমন্ত্রকে প্রচলিত রাখার স্বার্থে কেষকামলার মতো সামাজিক ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখা আবশ্যক।

সময়ের পরিক্রমায় সবকিছুই পরিবর্তিত হয়। নেত্রকোণার যোগাযোগ ব্যবস্থা হয়েছে উন্নত। একাত্ম হয়েছে সমগ্র দেশের উন্নয়নের পরিক্রমায়। এখানকার অধিবাসীগণ ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র বিশ্বে, বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটক এসেছে, এসেছে ধর্ম প্রচারকগণ। ব্যাপ্তি হয়েছে শিক্ষার, সমৃদ্ধ হয়েছে আন্তঃজালে। কাঙ্ক্ষিতভাবেই নেত্রকোণার পরিবেশে লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। হার্বার্ট স্পেন্সারের সামাজিক পরিবর্তনের সূত্র কিংবা পদার্থবিদ্যার আবেশন রীতি (theory of induction) অনুযায়ী সামাজিক রীতির পরিবর্তন (acculturation) হয়েছে। ইংরেজ ধর্মপ্রচারকের সংস্পর্শে নাইজেরিয়ার উমেফিয়া অঞ্চলের অত্যন্ত রক্ষণশীল ‘ইবো’ সম্প্রদায়ের সামাজিক রীতি পরিবর্তন বা ভেঙ্গে পড়াকে ম্যান বুকার বিজয়ী ঔপন্যাসিক চিনুয়া আচিবি তাঁর ‘Things Fall Apart’ গ্রন্থে চিত্রায়িত করেছেন অসাধারণ নৈপূণ্যে। পুরাতন রীতি বিলুপ্ত কিংবা পরিবর্তিত হয়; সমাজের চাহিদা ও উপযোগিতা বিবেচনায় চালু হয় নতুন প্রথার। আজকাল নেত্রকোণার বিভিন্ন স্থানে রাতের বেলা ‘আলোকিত ঘুড়ি উড়ানো’ খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বর্ষাকালের কোনো এক পূর্ণিমা রাতে উচিতপুর ঘাটে আয়োজন করা যেতে পারে ‘চন্দ্রালোকিত ঘুড়ি উৎসব’। সামাজিক প্রয়োজনে ঐতিহ্যবাহী প্রথাকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং উপযোগীতা বিবেচনায় নতুন রীতি প্রচলনে সবাইকে যুথবদ্ধ প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

লেখক পরিচিতি:
মঈনউল ইসলাম। পেশায় সরকারি চাকুরে। ভ্রমণ, বইপড়া এবং সামাজিক গবেষণায় তাঁর রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিদ্যায় সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর নিয়েছেন। এ ছাড়া, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাবলিক পলিসি ও গভর্নেন্স এবং যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উন্নয়ন অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর। সরকারি কর্মসূত্রে বিচিত্র মানুষ ও বিষয় সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন। অর্জিত এই অভিজ্ঞতাকে কাঠামো দেওয়ার প্রচেষ্টা থেকেই লেখালেখির হাতেখড়ি। [অনুধ্যান থেকে নেওয়া]

আপনার মতামত লিখুন :

 ফেসবুক পেজ

 আজকের নামাজের ওয়াক্ত শুরু

    নেত্রকোণা, ময়মনসিংহ, ঢাকা, বাংলাদেশ
    সোমবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২২
    ৪ Jumada I, ১৪৪৪
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ৫:০২ পূর্বাহ্ণ
    সূর্যোদয়ভোর ৬:২২ পূর্বাহ্ণ
    যোহরদুপুর ১১:৪৬ পূর্বাহ্ণ
    আছরবিকাল ২:৫০ অপরাহ্ণ
    মাগরিবসন্ধ্যা ৫:১১ অপরাহ্ণ
    এশা রাত ৬:৩০ অপরাহ্ণ
মোহনগঞ্জে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীর মুক্তিযোদ্ধা মির্জা আব্দুল গণি’র দাফন সম্পন্ন

মোহনগঞ্জে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীর মুক্তিযোদ্ধা মির্জা আব্দুল গণি’র দাফন সম্পন্ন

নেত্রকোণা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা 

নেত্রকোণা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা 

আবারও সাঁতারে বিশ্ব রেকর্ড গড়তে যাচ্ছেন নেত্রকোণার ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য

আবারও সাঁতারে বিশ্ব রেকর্ড গড়তে যাচ্ছেন নেত্রকোণার ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য

সংবিধান কমিটি ও গণপরিষদ সদস্য এড. সাদির উদ্দিন আহমেদ এর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী: শ্রদ্ধাঞ্জলি

সংবিধান কমিটি ও গণপরিষদ সদস্য এড. সাদির উদ্দিন আহমেদ এর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী: শ্রদ্ধাঞ্জলি

দুর্গাপুরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেকের দাফন সম্পন্ন

দুর্গাপুরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেকের দাফন সম্পন্ন

নেত্রকোণায় ঐতিহাসিক নাজিরপুর যুদ্ধ দিবস পালিত

নেত্রকোণায় ঐতিহাসিক নাজিরপুর যুদ্ধ দিবস পালিত

সর্বশেষ সংবাদ সর্বাধিক পঠিত
 
উপদেষ্টা সম্পাদক : দিলওয়ার খান
সম্পাদক ও প্রকাশক : মুহা. জহিরুল ইসলাম অসীম  
অস্থায়ী কার্যালয় : এআরএফবি ভবন, ময়মনসিংহ রোড, সাকুয়া বাজার, নেত্রকোণা সদর, ২৪০০ ।
ফোনঃ ০১৭৩৫ ০৭ ৪৬ ০৪, বিজ্ঞাপনঃ ০১৬৪৫ ৮৮ ৪০ ৫০
ই-মেইল : netrokonajournal@gmail.com
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।