সব
facebook netrokonajournal.com
প্রচলিত জমি বন্ধকী পদ্ধতি কি জায়েজ? সম্পর্কে ইসলাম কী বলে! | নেত্রকোণা জার্নাল

প্রচলিত জমি বন্ধকী পদ্ধতি কি জায়েজ? সম্পর্কে ইসলাম কী বলে!

প্রকাশের সময়:

প্রচলিত জমি বন্ধকী পদ্ধতি কি জায়েজ? সম্পর্কে ইসলাম কী বলে!

আমাদের দেশে জমি-জমা চাষ-বাস ও এসংক্রান্ত অনেক ধরনের লেনদেন চলে। এগুলোর শরয়ি বিধানাবলিও ইসলামী ফিকাহ ও ফাতাওয়ার কিতাবগুলোয় উল্লেখ রয়েছে।

বর্গাচাষ: এটা হচ্ছে একজনের জমিতে অপরজন শ্রম দিয়ে চাষ করে উভয়ে পূর্বচুক্তি অনুসারে উৎপাদিত ফসল সমান অর্ধেক করে বা কমবেশি ভাগ করে নেবে। এ ক্ষেত্রে উৎপাদনের প্রাসঙ্গিক অন্যান্য খরচ ও ব্যয়ভারের শরিয়তসম্মত তিনটি পদ্ধতির যেকোনো একটি গ্রহণ করা যেতে পারে।

১. জমি এবং বীজ একজন বহন করবে আর চাষাবাদের যাবতীয় খরচ দ্বিতীয় জন বহন করবে।

২. শুধু জমি একজনের আর চাষাবাদের জন্য যাবতীয় খরচ দ্বিতীয় জন আঞ্জাম দেবে।

৩. জমি এবং বীজসহ হালের জন্য গরু অথবা মেশিনের খরচ একজন বহন করবে আর দ্বিতীয় জন শুধু কাজ করবে।
এই তিনটি ছাড়া অন্য পদ্ধতি শরিয়তসম্মত নয়।(ফাতহুল কাদির : ৯/৪৭৬)

জমি বন্ধক রাখার প্রচলিত পদ্ধতি
বন্ধক রাখা হয় ঋণ আদায়ের নিশ্চয়তাস্বরূপ। এতে ঋণদাতা নিশ্চিত থাকেন যে ঋণ আদায় না করলেও বন্ধককৃত বস্তু থেকে আদায় করে নেওয়া যাবে। পবিত্র কোরআনেও এর নির্দেশ রয়েছে।আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর যদি তোমরা সফরে থাকো এবং কোনো লেখক না পাও, তাহলে হস্তান্তরিত বন্ধক রাখবে। আর যদি তোমরা একে অপরকে বিশ্বস্ত মনে করো, তবে যাকে বিশ্বস্ত মনে করা হয়, সে যেন স্বীয় আমানত আদায় করে এবং নিজ রব আল্লাহকে ভয় করে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৮৩)

বন্ধককৃত বস্তু বন্ধকগ্রহীতার কাছে আমানতস্বরূপ।বন্ধকি জমি থেকে বন্ধকগ্রহীতার কোনো ফায়দা হাসিল করা নাজায়েজ ও হারাম। এমনকি বন্ধকদাতা এর অনুমতি দিলেও পারবে না। কারণ বন্ধকি জমি থেকে বন্ধকগ্রহীতা কোনো ধরনের ফায়দা উপভোগ করা সুদের অন্তর্ভুক্ত, যা হারাম। (বাদায়েউস সানায়ে : ৬/১৪৬)

ইবনে সিরিন (রহ.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক লোক সাহাবি ইবনে মাসউদ (রা.)-এর কাছে জিজ্ঞেস করল, এক ব্যক্তি আমার কাছে একটি ঘোড়া বন্ধক রেখেছে, তা আমি আরোহণের কাজে ব্যবহার করেছি।

ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, তুমি আরোহণের মাধ্যমে এর থেকে যে উপকার লাভ করেছ তা সুদ হিসেবে গণ্য হবে। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদিস : ১৫০৭১)

বিখ্যাত তাবেয়ি ইমাম কাজি শুরাইহ (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সুদ পান করা কিভাবে হয়ে থাকে? তিনি বলেন, বন্ধকগ্রহীতা বন্ধকি গাভির দুধ পান করা সুদ পানের অন্তর্ভুক্ত। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদিস : ১৫০৬৯)

প্রচলিত জমি বন্ধক পদ্ধতির বৈধ বিকল্প
১. বন্ধকি জমি থেকে বন্ধকগ্রহীতা উপকৃত হতে চাইলে এ পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারে যে বন্ধকি চুক্তি বাতিল করে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা পদ্ধতি অবলম্বন করবে।

অর্থাৎ যত দিন পর্যন্ত ঋণের টাকা শোধ না হয় ঋণদাতা জমিটি ইজারা পদ্ধতিতে তা ভোগ করবে এবং তার ন্যায্য ভাড়াও মালিককে আদায় করবে। এ ক্ষেত্রে ঋণ ও ইজারাচুক্তি দুটি ভিন্ন হতে হবে, দুটি চুক্তিকে মিলিয়ে একটি অপরটির ওপর শর্তযুক্ত হতে পারবে না। (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া ৫/৪৬৫, ইমদাদুল আহকাম ৩/৫১৮)

২. অথবা সে বন্ধকদাতার সঙ্গে ‘বাই বিল ওয়াফা’ চুক্তি করবে। অর্থাৎ বন্ধকগ্রহীতার কাছে ঋণী ব্যক্তি তার জমিটি বিক্রি করে দেবে এই ওয়াদার ওপর যে ঋণ পরিশোধ হওয়ার পর বন্ধকগ্রহীতা আবার জমিটি তার কাছে বিক্রি করে দেবে। এ ক্ষেত্রে বন্ধকগ্রহীতার মালিকানায় যত দিন থাকবে সে তা মালিক হিসেবে ভোগ করতে পারবে। (ইমদাদুল আহকাম : ৩/৫১১)

ইজারা কী?
স্বল্প বা দীর্ঘ মেয়াদে জমি ইজারা তথা ভাড়া দেওয়া বৈধ। ভাড়া নিয়ে যেকোনো বা এমন বৈধ কাজে লাগানো জায়েজ হবে যার কারণে জমির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না হয়।

জমির মালিক যদি ইজারাদারকে সাধারণভাবে সব ধরনের ফসল চাষ করার অনুমতি দিয়ে দেয়, তাহলে সে যেকোনো শস্য চাষ করতে পারবে।(হেদায়া ৩/২৯৬)। গাছসহ বাগান ইজারা দেওয়া শুদ্ধ নয়। (রদ্দুল মুহতার ৫/৫)

গাছের ফল বের হওয়ার আগে ফল বিক্রি বৈধ নয়। বরং ফলের মুকুল বের হওয়ার পর বিক্রি বৈধ হবে।অনুরূপ অগ্রিম কয়েক বছরের জন্য বাগানের ফল বিক্রি বৈধ নয়। তবে এর একটি বৈধ পদ্ধতি এভাবে হতে পারে যে ফলগাছ বিক্রি করে দেবে এবং মালিক বিক্রীত গাছ তার বাগানে রাখার জন্য ক্রেতাকে অনুমতি দিয়ে দেবে।

অথবা গাছ বিক্রির পর ক্রেতা মালিক থেকে বাগান ভাড়া নেবে। পরবর্তীকালে ইচ্ছা করলে ফলের মৌসুম শেষ হলে কিংবা কয়েক বছর পর আবার ওই মূল্যে বা এর চেয়ে কমবেশি দিয়ে গাছগুলো মালিকের কাছে বিক্রি করে দেবে।(রদ্দুল মুহতার ৫/২০, আহসানুল ফাতাওয়া ৭/২৬৭)

বোঝা গেল, সমাজে প্রচলিত ‘রেহান’ কোনো শরিয়তসম্মত ক্রয়-বিক্রয় নয়।

রাহন বা ঋনের মূলনিতীঃ
শরিয়তের পরিভাষায় ‘রাহন’ হলো কোনো দাবির বিপরীতে কোনো বস্তুকে এমনভাবে আটক রাখা, যাতে আটককৃত বস্তু দিয়ে দাবি বা অধিকার বা পাওনা আদায় সম্ভব হয়। যেমন- ঋণ। সোজা কথায়, রেহান অর্থ বন্ধক।

মোট কথা বন্ধক রাখার বিষয়টি ইসলামি শরিয়তে অনুমোদিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘যদি তোমরা সফরে থাক এবং কোনো লেখক না পাও তবে হস্তান্তরকৃত/অধিকৃত/আয়ত্তাধীন বন্ধকী বস্তু নিজ দখলে রাখবে।’ (সূরা বাকারাহ : ২৮৩)

সূরা মুদ্দাচ্ছিরের ৩৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে : ‘প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের দায়ে আবদ্ধ (রাহিনাহ)।’

রাসূলুল্লাহ(ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম) নিজে এক ইহুদি থেকে বাকিতে কিছু খাদ্য ক্রয় করেছিলেন এবং সেই দেনার গ্যারান্টি হিসেবে তাঁর বর্মটি ইহুদির কাছে রেহান (বন্ধক) রেখেছিলেন।

বুরহানুদ্দিন আবুল হাসান আলী ইবনে আবুবকর আল-ফারগানি আল-মারগিনানি (রহ:) তার আল-হিদায়া কিতাবের ‘রাহন’ অধ্যায়ে বলেছেন, ‘রেহান (বন্ধক) রাখা জায়েজ হওয়ার ব্যাপারে ইজমা রয়েছে। রেহান (বন্ধক) হচ্ছে নিজের পাওনা উসুল নিশ্চিত করার নিমিত্তে সম্পাদিত একটি চুক্তি।’

ইমাম শাফেয়ি (রহ:) বলেছেন, বন্ধকী বস্তু (রেহান) বন্ধক গ্রহীতার কাছে আমানতস্বরূপ থাকে।
আল-মারগিনানি (রহ:) তাঁর আল-হিদায়া কিতাবের ‘রাহন’ অধ্যায়ে আরো বলেছেন, ‘বন্ধক’ (রেহান) গ্রহীতা ব্যক্তির জন্য জায়েজ নেই বন্ধকের (রেহান) মাল দিয়ে উপকৃত হওয়া। সেবা নেয়া, বসবাস করা বা পরিধান করা কোনোটাই জায়েজ নয়। রেহান রাখা হয় শুধু নিজের পাওনা আদায় করার জন্য।

বলা বাহুল্য, কট প্রথায় জমির বেনিফিট-টা মূল ঋণের অতিরিক্ত। তাই তা সুদ। শরীয়াহর ব্যাপারে অসচেতনতার কারণে কট প্রচলন আজ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

বন্ধককে কেন্দ্র করে সুদের লেনদেন গ্রামে-গঞ্জে আরো বহুভাবে হয়ে থাকে। একটি মূলনীতি মনে রাখবেন, ঋণের বিপরীতে বন্ধক গ্রহণ করে যে কোন উপায়ে সেটা থেকে গ্রহীতা কোনরূপ উপকার হাসিল করলে সেটাই সুদ বলে বিবেচিত হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন।

বিকল্প বা জায়েয সুরতঃ
কট প্রথার বিকল্প হল, ঋণদাতা জমি লীজ নিয়ে তা থেকে উপকৃত হবে। তবে এর জন্য শর্ত হল-
ক.করজ ও লীজ চুক্তিদুটি সম্পূর্ণরূপে স্বতন্ত্রভাবে হতে হবে।

খ.একটি চুক্তির সাথে আরেকটি চুক্তি কোনভাবেই শর্তযুক্ত হবে না। সুতরাং করজ প্রদানের পর করজগ্রহীতা তার জমি লীজ দিতে অস্বীকার করলে তাকে চাপ প্রয়োগ করা যাবে না। কেবল সঠিক অর্থে জমি বা অন্য কিছু বন্ধক প্রদানের জন্য বলতে পারবে।

গ.জমির রেন্ট উরফ অনুযায়ী ন্যায়সঙ্গত হতে হবে।

প্রশ্নঃ জমি বর্গা চাষ বা ইজারা দেওয়ার শরী‘আতসম্মত পন্থা কি কি?

জমি বর্গা দেওয়ার ক্ষেত্রে উপরে উল্লেখিত নিতী গুলো মেনে বর্গা দেওয়া যাবে-
রাফে‘ বিন খাদীজ (রাঃ) বলেন, আমার দুই চাচা নবী করীম (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম)-এর যুগে জমি বর্গা দিতেন এভাবে যে, নালার পাশে যে শস্য হবে তা তাদের অথবা জমির মালিক (শস্য নেয়ার জন্য) কিছু জমি পৃথক করে দিতেন। নবী করীম (ছাঃ) এরূপ করতে নিষেধ করলেন।
হানযালা (রহঃ) বলেন, আমি রাফে‘ বিন খাদীজ (রাঃ)-কে বললাম, স্বর্ণমুদ্রা ও রৌপ্যমুদ্রার বিনিময়ে জমির ভাড়া দেয়া যাবে কি? তিনি বললেন, এতে কোন বাধা নেই (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৯৭৪)।

জমিতে উৎপাদিত শস্য পারস্পরিক ভাগাভাগির চুক্তিতে বর্গা দেওয়া শরী‘আত সম্মত।
আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম) খায়বারের জমিতে উৎপাদিত ফল-ফসল অর্ধেক প্রদানের শর্তে বর্গা দিয়েছিলেন (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৯৭২)।

আপনার মতামত লিখুন :

 ফেসবুক পেজ

 আজকের নামাজের ওয়াক্ত শুরু

    নেত্রকোণা, ময়মনসিংহ, ঢাকা, বাংলাদেশ
    মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২২
    ৪ Jumada I, ১৪৪৪
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ৫:০২ পূর্বাহ্ণ
    সূর্যোদয়ভোর ৬:২২ পূর্বাহ্ণ
    যোহরদুপুর ১১:৪৬ পূর্বাহ্ণ
    আছরবিকাল ২:৫০ অপরাহ্ণ
    মাগরিবসন্ধ্যা ৫:১১ অপরাহ্ণ
    এশা রাত ৬:৩০ অপরাহ্ণ
এর আরও খবর
যুবরাজ সালমানকে সৌদি আরবের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা

যুবরাজ সালমানকে সৌদি আরবের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা

জুমার দিনের ফজিলত ও জুমার আগে চার আমল

জুমার দিনের ফজিলত ও জুমার আগে চার আমল

প্রস্রাব-পায়খানার পর ঢিলা বা টিস্যু ব্যবহারের পরেও পানি খরচ কি খুব জরুরি?

প্রস্রাব-পায়খানার পর ঢিলা বা টিস্যু ব্যবহারের পরেও পানি খরচ কি খুব জরুরি?

মাদকের ভয়াল থাবা: শাস্তি ও প্রতিকারের উপায়

মাদকের ভয়াল থাবা: শাস্তি ও প্রতিকারের উপায়

দুর্গাপুরে আবু তালহা রা: মাদ্রাসায় ২৬ জন শিক্ষার্থীর কোরআন শরীফ ছবকদান

দুর্গাপুরে আবু তালহা রা: মাদ্রাসায় ২৬ জন শিক্ষার্থীর কোরআন শরীফ ছবকদান

কন্যা সন্তান উত্তম : মুফতি আতাউল্লাহ বাশার

কন্যা সন্তান উত্তম : মুফতি আতাউল্লাহ বাশার

সর্বশেষ সংবাদ সর্বাধিক পঠিত
 
উপদেষ্টা সম্পাদক : দিলওয়ার খান
সম্পাদক ও প্রকাশক : মুহা. জহিরুল ইসলাম অসীম  
অস্থায়ী কার্যালয় : এআরএফবি ভবন, ময়মনসিংহ রোড, সাকুয়া বাজার, নেত্রকোণা সদর, ২৪০০ ।
ফোনঃ ০১৭৩৫ ০৭ ৪৬ ০৪, বিজ্ঞাপনঃ ০১৬৪৫ ৮৮ ৪০ ৫০
ই-মেইল : netrokonajournal@gmail.com
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।